আম্ফানের তান্ডবে ধ্বংসস্তূপ হলো সাতক্ষীরা

0 ১,২৩১

আহাদুর রহমান:
বিধ্বস্ত সুন্দরবন, ২২টি পয়েন্টে ভেঙেছে বাঁধ, ঢুকছে পানি। ডাল ভেঙেছে ছোট-বড় গাছের। উপড়ে গেছে বিদ্যুতের খুঁটি। জেলার বেশির ভাগ অঞ্চলেই নেই বিদ্যুৎ। এরকম অবস্থা সাতক্ষীরা সদরে গত ২০ বছরেও হয়নি। উপকূলীয় উপজেলা গুলোর অবস্থা আরও শোচনীয়। ঘূর্ণিঝড় ‘আম্পানের’ তান্ডবে লন্ডভন্ড হয়েছে সাতক্ষীরা।

 
বিকেল ৪টার দিকে সাতক্ষীরার উপকূলে আঘাত হানে ঘূর্ণিঝড় আম্ফান। বুধবার সন্ধ্যা ৭টার পর থেকেই ঝড়ের গতিবেগ বাড়তে থাকে। সাতক্ষীরা আবহাওয়া অফিসের উচ্চমান পর্যবেক্ষক জুলফিকার আলী রিপন জানান, বুধবার (২০ মে) রাত ৮টার দিকে ১৪৮ কিলোমিটার বেগে আঘাত হানে ঘূর্ণিঝড় আম্পান। এর আগে বাতাসের গতিবেগ ছিলো ১২০কিলোমিটার। টানা চারঘন্টা একই গতিতে দাপট দেখিয়ে সবকিছু ভেঙে তছনছ করে যায় আম্পান। ঘূর্ণিঝড় ‘আম্পানের’ তান্ডবে গোটা জেলা এখন ধ্বংসস্ত‚পে পরিণত হয়েছে। সড়কের ওপর অসংখ্য গাছ উপড়ে পড়ে সাতক্ষীরা সদরসহ সকল উপজেলা ও ইউনিয়নগুলোর যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। বিদ্যুতের খুঁটি উপড়ে পড়েছে, ছিড়ে গেছে লাইন। মানুষের ঘরবাড়ি, ফসলি জমির ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে ব্যাপক।
জেলার সাতটি ইউনিয়নে ২২টি পয়েন্টে উপকূল রক্ষাবাঁধ ভেঙে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার বুড়িগোয়ালীনি ইউনিয়নের চুনা নদীর বেড়িবাঁধ ভেঙে গেছে। ইউনিয়নের দাতিনাখালী এলাকার মাসুদ মোড় সংলগ্ন এলাকায় ৩০ হাত বাঁধ ভেঙে যায়। বুধবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে এ বাঁধ ভেঙে যায়।
বুড়িগোয়ালীনি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ভবতোষ কুমার মন্ডল জানান, ৩০ হাত বাঁধ ভেঙে প্রবল বেগে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করছে। ইতিমধ্যে একটি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। ইউনিয়নের ১৫ টি গ্রামই প্লাবিত হয়ে যাবে। দাতিনাখালী এলাকায় এক মুরগির খামারে পানি ঢুকে ১৫০০ রেডি মুরগী মারা গেছে। এর থেকে বেশী ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এই মুহূর্তে বলা সম্ভব নয়।
শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা, পদ্মপুকুর, কাশিমাড়ি, বুড়িগোয়ালিনী এবং আশাশুনি উপজেলার খাজরা, প্রতাপনগর ও শ্রীউলা ইউনিয়নের ২২টি পয়েন্টে বেড়িবাঁধ ভেঙে গেছে। আনুলিয়া, প্রতাপনগর, শ্রীউলা, আশাশুনি, খাজরার কিছু অংশ ও আশাশুনি সদরের কিছু অংশ সম্পূর্ণরুপে প্লাবিত হয়েছে। এসব ইউনিয়নের শতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। প্রধান প্রধান সড়কগুলো থেকে ফায়ার সার্ভিসের মাধ্যমে গাছপালা সরিয়ে নেয়া হচ্ছে। গাছপালা সরাতে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে জেলা পুলিশও।
আশাশুনি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মীর আলিফ রেজা জানান, তিনি পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাকে সাথে নিয় ভাঙন কবলিত হাজরাখালি এলাকা পরিদর্শন করেছেন।
শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আ ন ম আবুজার গিফারী বলেন, গাবুরা, পদ্মপুকুর, কাশিমাড়ি, বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের অন্তত ৮টি পয়েন্টে কয়েকশত মিটার বেড়িবাঁধ ভেঙে এলাকা প্লাবিত হয়েছে। মানুষকে আশ্রয় কেন্দ্রে নেওয়া হয়েছে।
সাতক্ষীরা পানি উন্নয়ন বোর্ড-১ (শ্যামনগর-কালিগজ্ঞ) এর নির্বাহী প্রকৌশলী আবুল খায়ের জানান, আমার এলাকার মধ্যে উপকূলীয় ৩৮০ কিলোমিটার বাঁধ রয়েছে। এর মধ্যে ১.৭ কিলোমিটার বাঁধ ভেঙে গেছে। মেরামতের চেষ্টা করা হচ্ছে।
সাতক্ষীরা পানি উন্নয়ন বোর্ড-২ এর নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুজ্জামান খানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তার ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়।
তালা সদর থেকে সাতক্ষীরা জেলা সদরের যোগাযোগের বাইপাস সড়ক পাটকেলঘাটা-তালা সড়ক। ১৩ কিলোমিটার এই সড়কে শতাধিক গাছ পড়ে রাস্তা বন্ধ হয়ে গেছে।
এদিকে সাতক্ষীরা সদর উপজেলায় গত ২০ বছরে রেকর্ড পরিমান ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সিডর, আইলা, বুলবুলেও এত ক্ষতি হয়নি সদরের। সাতক্ষীরা সদরের লাবসা গ্রামের মনিরুজ্জামান সোহান বলেন, আমাদের বাড়ি সহ আশে পাশের বিভিন্ন বাড়িতে অনেক ক্ষতি হয়েছে। ঝড়ে উড়ে গেছে টিনসেড। বড় বড় গাছগুলো ভেঙ্গে গেছে। এখানে কোন বাড়ির বিদ্যুত সংযোগ নেই। তার ছিঁড়ে গেছে।
এদিকে ঝড়েরর তান্ডবে গাছ চাপা পড়ে শহরের বাঁকাল এলাকায় শামসুর রহমান (৬০) ও কামালনগর সঙ্গীতা মোড়ে করিমন নেছা (৪০) নামে দু’জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়া গেছে।
তালা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইকবাল হোসেন জানান, সড়কের গাছগুলো সরিয়ে নিতে আমরা রাত থেকেই কাজ শুরু করেছি। ইসলামকাটি সড়কটিতে বড় বড় গাছসহ রাস্তার অর্ধেক উপড়ে গেছে। সেজন্য একটু দেরি হচ্ছে। আমরা দ্রæততম সময়ের মধ্যেই যোগাযোগ ব্যবস্থা সচল করার চেষ্টা করছি।
সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক এস.এম মোস্তফা কামাল জানান, ঘূর্ণিঝড় আম্ফানে সাতক্ষীরা জেলা শহরসহ গোটা জেলা লÐভÐ হয়ে গেছে। বিদ্যুতের খুঁটি ও গাছপালা উপড়ে পড়েছে। টিনের ছাউনি উড়ে গেছে। উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তাদের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করতে বলা হয়েছে। উপকূলীয় বাঁধ মেরামতের জন্য সেনাবাহিনীকে পাউবোর সহযোগিতা করতে বলা হয়েছে।
জেলা প্রকল্প কর্মকর্তা আব্দুল বাসেত জানান, জেলার সাতটি উপজেলায় ২২ হাজার ৫১৫ ঘরবাড়ি সম্পূর্ণরুপে ধ্বসে পড়েছে। এছাড়া আংশিক ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে ৬০ হাজার ৯১৫টি ঘরবাড়ি। সব মিলিয়ে ৮৩ হাজার ৪৩০টি ঘরবাড়ির ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। জেলায় আর্থিক ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এখনো নিরূপণ করা যায়নি।
এদিকে সন্ধ্যা হতে মধ্যরাত পর্যন্ত ঘূর্ণিঝড় আমফান এর তান্ডব চলাকালে সাতক্ষীরা সদরের বিভিন্ন স্থানে গাছপালা এবং গাছের ডাল রাস্তার উপর ভেঙে পড়লে চলাচলে বাধা সৃষ্টি হয়। এতে আহত ব্যক্তিদের উদ্ধারে এবং ত্রাণ ও অন্যান্য সহায়তা প্রদান বাধাগ্রস্ত হতে পারে আশঙ্কা করে পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমানের নির্দেশে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, সদর সার্কেল মির্জা সালাহউদ্দিন এর নেতৃত্বে সাতক্ষীরা থানার অফিসার ইনচার্জ মোঃ আসাদুজ্জামান, ইন্সপেক্টর তদন্ত সহ অন্যান্য পুলিশ সদস্য বৃন্দ স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও স্বেচ্ছাসেবকদের সহায়তায় অতি দ্রæত ভেঙে পড়া গাছ কেটে মহাসড়কের স্বাভাবিক করেন।