কালিগঞ্জে চেয়ারম্যান সাফিয়ার দুর্নীতি ঢাকতে রাতারাতি মেশিন বদল

কর্তৃক Abdullah Al Mahfuj
০ কমেন্ট 688 ভিউস

হাফিজুর রহমান, কালিগঞ্জ থেকে: দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্ত চলাকালীন তদন্ত কর্মকর্তার পরস্পর যোগ সূত্রে চেয়ারম্যান সাফিয়া পারভীন বিভিন্ন প্রকল্পের অনিয়ম দুর্নীতি ঢাকতে রাতারাতি পুরাতন বাটারফ্লাই সেলাই মেশিন সরিয়ে নতুন সিঙ্গার সেলাই মেশিন বদল করার সত্যতা মিলেছে। সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলার কৃষ্ণনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় নেত্রী সাফিয়া পারভীনের বিরুদ্ধে উন্নয়ন সহায়তার বিভিন্ন প্রকল্পের দুর্নীতির অভিযোগের তদন্ত চলাকালীন গতকাল মঙ্গলবার (২৭ ডিসেম্বর) সকাল ৮টার সময় সরেজমিনে ইউনিয়ন ঘুরে এর সত্যতা পাওয়া যায়।
২০২১-২২ বছরে ইউনিয়ন পরিষদ উন্নয়ন বরাদ্দ হতে ১ লক্ষ ৭৬ হাজার ৬০০ টাকায় ১৭ জন অসহায় দুস্থ মহিলাদের মাঝে সেলাই মেশিন বিতরণ করা হয়। এই প্রকল্পে চেয়ারম্যানের চাচি ছাড়াও একেবারে তার কাছের গাড়িচালক, চৌকিদার, ইউপি সদস্যদের কন্যা, নাতি, ধণাঢ্য পাকা টাইলস করা বাড়ির মালিকরা সহ ১৭ জনের মাঝে পুরাতন ৪৭০০ টাকা মূল্যের বাটারফ্লাই মেশিন বিতরণ করা হয়। কিন্তু প্রকল্পে প্রাক্কলিত প্রতিটি মেশিনের মূল্য ধরা হয় ১০,৩৮৮ টাকা। কালিগঞ্জ থানা রোডে আহসানিয়া মেশিনারি হাউজ হতে আগাম সাদা ভাউচার প্যাড নিয়ে নতুন মেশিন দেখিয়ে ভুয়া ভাউচার জমা দিয়ে হাজার হাজার টাকা লুট করা হয়। বিষয়টি জানতে পেরে ইউনিয়নবাসী চেয়ারম্যান সাফিয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান বরাবর গত ৯ সেপ্টেম্বর লিখিত অভিযোগ দায়ের করে।
উক্ত অভিযোগের প্রেক্ষিতে দুর্নীতি দমন কমিশন বিষয়টি তদন্তের জন্য কালিগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কে নির্দেশ দেন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ঘটনার সরে জমিনে তদন্ত করে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেন। এর প্রেক্ষিতে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ওয়াসিম উদ্দিন গত ২২ ডিসেম্বর বেলা ১০টার সময় সরেজমিনে তদন্ত না করে ২৬ ডিসেম্বর সকাল ১০টার মধ্যে তার অফিসে প্রকল্পসমূহের কাগজ জমা দিতে বলে তিনি ছুটিতে চলে যান। এই এই সুযোগে চেয়ারম্যান সাফিয়া পারভীন তদন্ত কর্মকর্তার যোগসাযোগে তালিকাভুক্ত ১৭ জনের বাসা হতে ক্যাডার বাহিনী পাঠিয়ে পুরাতন বাটারফ্লাই মেশিন সারিয়ে নিয়ে একেবারে নতুন সিঙ্গার সেলাই মেশিন রেখে আসে। এবং প্রত্যেককে বলে আসে কোন অফিসার বা সাংবাদিক আসলে বলবে ৬/৭ মাস আগে আমাদেরকে নতুন মেশিন দিয়েছে। তা না হলে কিন্তু ইউনিয়ন পরিষদের সকল সরকারি সুযোগ সুবিধা এবং বিভিন্ন ভাতার কার্ড বাতিল করা হবে। এইভাবে রাতারাতি প্রত্যেকের বাড়িতে নতুন মেশিন পৌঁছে দেওয়া হয় এবং পুরাতনটা সরিয়ে ফেলা হয়। যাতে করে তদন্ত কার্যক্রম চলার সময় তদন্ত কর্মকর্তা নানান বিতর্কে ঘটনা ধামাচাপা দিয়ে প্রকৃত ঘটনা আড়ালে পড়ে যায়।
অথচ এই প্রকল্পের ঠিকাদার হিসেবে ট্রেড লাইসেন্স দিয়ে যার নিকট থেকে সই করে কাগজপত্র সম্পাদন করা হয়েছে তিনি ইউনিয়ন পরিষদের পাশে কৃষ্ণনগর গ্রামের কানাইলাল ঘোষের পুত্র গোবিন্দ প্রসাদ ঘোষ। এই কথিত ঠিকাদার তার সমস্ত দুর্নীতির নথি পত্রে স্বাক্ষর করে ক্রস চেক এর মাধ্যমে টাকা তুলে হাতিয়ে নিয়েছে। তবে বিষয়টি গোবিন্দ প্রসাদ ঘোষ স্বীকার করে বলেছেন বর্তমান চেয়ারম্যান সাফিয়া পারভীনের বাবা কে এম মোশারফ হোসেন চেয়ারম্যান থাকা কালীন অবস্থায় এইভাবে আমার স্বাক্ষর নিয়ে টাকা উত্তোলন করতো। এ চেয়ারম্যানের আমলেও আমি তাই করছি। বিষয়টা উনারা ভালো বলতে পারবেন আমি ভালো কিছু বুঝিনা। সেলাই মেশিন বিষয়ে কথা জানতে চাইলে তিনি জানান আপনারা তদন্ত করে যেটা জানতে পেরেছেন সেটা সত্য।
সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, ৯ নং ওয়ার্ডের সদস্য আবদুল গাফফারের কন্যা রেহানা পারভীন, মহিলা ইউপি সদস্য সাজিদা খাতুনের নাতনি রঞ্জিতা আখতার বেবি, চৌকিদার খায়রুলের স্ত্রী রেবেকা সুলতানা, চেয়ারম্যানের বডিগার্ড কাম ড্রাইভার হাফিজুলের স্ত্রী নুরজাহান বাড়ির কাজের মহিলা সহ প্রায় সবাই তার নিজের লোকএই ১৭ জনের তালিকায় নাম থাকলেও প্রকৃত অসহায় দুস্থরা কেউ পায়নি। এ ব্যাপারে রঘুনাথপুর গ্রামের আব্দুল গাজীর স্ত্রী আফরোজা খাতুন সাংবাদিকদের জানান গত ২:দিন আগে চেয়ারম্যানের লোকজন পুরাতন মেশিনটি নিয়ে নতুন এই সিঙ্গার মেশিনটি দিয়ে গেছে বিষয়টি সম্পর্কে তিনি এর বেশি কিছু জানেন না। প্রসঙ্গত ২০২১-২২ অর্থবছরে উন্নয়ন বাজেটে ইউনিয়ন পরিষদের উন্নয়ন সহায়তা খাতের আওতায় সাধারণ বরাদ্দ বিবিজি হতে প্রথম কিস্তিতে৩,৮১,৬০০ টাকা এবং দ্বিতীয় কিস্তিতে ৩,৮৪ ৬০০ টাকা মিলে মোট ৭ ৬৬,২০০ টাকায় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ৫টি প্রকল্প গ্রহণ করে। এর মধ্যে ইউনিয়ন পরিষদ চত্বরে বঙ্গবন্ধু মুরাল নির্মাণ বাবদ ৩ লক্ষ টাকা বরাদ্দের মধ্যে হতে ১,৩০ ০০০ টাকা চুক্তিতে কাজ করিয়ে বাকি ১ লক্ষ ৭০ হাজার টাকা লুট করে। কৃষ্ণনগর ইউনিয়ন জুড়ে জলাবদ্ধতা নিরসনে পাইপ বসানোর নামে ৮৪,৬০০ টাকার বরাদ্দে ২০ হাজার টাকায় পাইপ কিনে ৬৪,০০০ টাকা লুট করে। ইউনিয়নের ৯টি ওয়ার্ডে অসহায় দুঃস্থ মহিলাদের সেলাই মেশিন বিতরণের জন্য১,৭৬,৬০০ টাকা বরাদ্দের থেকে ৪,৭০০ টাকা করে ১৭টি পুরাতন বাটারফ্লাই মেশিন কিনে বিতরণ করে প্রায় ৮০ হাজার টাকা আত্মসাৎ করে। এছাড়াও বালিয়াডাঙ্গা স্বাস্থ্য কল্যাণ কেন্দ্র হতে মোসলেম শেখার বাড়ি অভিমুখে নতুন মটর ক্রয় ও পানির লাইন সংস্কার বাবদ ১,৮০ ০০০ টাকা প্রকল্প নিয়ে ৩০ হাজার টাকা খরচ করে ১ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা লুটপাট সহ ২৫ হাজার টাকায় শিশু খাদ্য বরাদ্দের নামে ১০,০০০টাকা লুটপাট এর ঘটনায় দুর্নীতি দমন কমিশন চেয়ারম্যানের নিকট ইউনিয়নবাসী অভিযোগ দায়ের করে। উক্ত লুটপাট ও নিজের অপকর্ম থাকতে এখন এই দৌড়ঝাঁপ, টানা হেচড়া শুরু হয়েছে।

রিলেটেড পোস্ট

মতামত দিন

error: Content is protected !!