নেতৃত্বে আমলা মন্ত্রী এমপি ধান কাটা কামলা

পীর হাবিবুর রহমান

0 ১০৫

করোনার মহাপ্রলয়ে মৃত্যু ও ভয়ের বিভীষিকাময় অসহ্য দমবন্ধ জীবন এতটা অসহায়, এতটা বিরক্তি বিষাদের যে মাঝে মাঝে মনে হয় এমনিতেই না মরে যাই। এমনিতেই হৃদরোগী, এখন মেজাজও চড়া। একমাত্র রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনা ছাড়া মন্ত্রিসভার সংখ্যাগরিষ্ঠের ওপর কোনো ভরসা নেই। শেখ হাসিনা কথা বললে জনগণ সাহস মনোবল শক্তি আশা ও সত্য পায়। একমাত্র তিনিই পরম বিশ্বাস ভরসার জায়গায়। কিন্তু এমন অথর্ব দুর্বল অর্ধেক অরাজনৈতিক ব্যবসায়ী মন্ত্রিসভা এ দেশে কখনো আসেনি। বিশেষ করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক স্বপনের চরম ব্যর্থতার লজ্জা মানার মতোন নয়। চীনের করোনার ভয়াবহতার পর দেশের সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল, চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী সমন্বয়ে পিপিই, মাস্ক, আইসিইউ, ভেনটিলেশনে প্রস্তুতি না নেওয়ার ব্যর্থতা ক্ষমা করার মতোন নয়। সচিব, স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালকসহ সবাই নির্লজ্জ ব্যর্থতা নিয়ে চেয়ারে বসে আছেন। তবু কেউ জনগণের কাছে ক্ষমাও চাননি, উল্টো গা জ্বালা ধরা মিথ্যাচার, তৃপ্তির কথা শুনিয়ে সত্য গোপনের চেষ্টা করেছেন, প্রধানমন্ত্রী ভিডিও কনফারেন্সে সত্য উন্মোচন করিয়েছেন।

কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে করোনা ওয়ার্ডে তালা মেরে রাখা হয় বলে খবর এসেছে। একটা নির্দিষ্ট সময়ে খাবারের জন্য মাইকিং করে ওয়ার্ডের দরজায় খাবার ও ওষুধ রেখে দেওয়া হয়। রোগীর যত কষ্টই হোক আর শ্বাসকষ্টই থাকুক তখনই সেগুলো আনতে হয়। বক্সে রোগীদের নাম লেখা থাকে। নিজ দায়িত্বেই ওষুধ খেতে হয়! কুর্মিটোলা হাসপাতালে টয়লেটে গিয়ে রোগী পড়ে মরে ছিল। কেউ জানেই না কখন মারা গেছে। ছয় তলা থেকে নেমে পাঁচ তলায় গিয়ে খাবার পানি আনতে হয়। অন্য যে কোনো দরকারেও নিচে নামতে হয় রোগীকেই! মুগদায় মারা যাওয়া সিটি ব্যাংকের তরুণ কর্মকর্তার দুবার পরীক্ষায় নেগেটিভ এলেও মৃত্যুর পর পজিটিভ এসেছে! সারা দেশের মানুষ চিকিৎসাসেবা পায় না। স্বাস্থ্যমন্ত্রী, সচিব, মহাপরিচালক একটা হাসপাতালও পরিদর্শন করেন না। মার্চে মন্ত্রী একবার গিয়েছিলেন, তারপর কোথাও না কেউ! সারা দেশেও না! কেন? তিন শর মতোন চিকিৎসক আক্রান্ত। ৬৬০ জন স্বাস্থ্যকর্মী। মন্ত্রী ও কর্তারা কী করছেন? চিকিৎসকরা সুরক্ষা না পেলে মানুষ সেবা পাবে কী করে? আর কত সময় নষ্ট? সামনে ভয়ঙ্কর পরিণতি নয় তো? লকডাউনেরও ইতি ঘটেছে। এর মধ্যেও টাকার গরমিল, জেএমআইর ভেজাল মাস্ক বাণিজ্য!

বিতর্কিত সিইসি আজিজ তুমুল আন্দোলনে পদত্যাগ না করায় শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ‘তিতা বেহায়া’। আজ স্বাস্থ্যমন্ত্রী, কর্মকর্তাসহ কিছু মন্ত্রীকে মানুষ কী বলছে কান পাতলেই শোনা যায়।

তবু ছেলেবেলার ইচ্ছার বিরুদ্ধে তিতা ওষুধ খাওয়ার মতোন তাদের আমাদের মানতে হবে। মানার শক্তি জনগণের সহ্যের সীমা অতিক্রম করেছে। সেই সঙ্গে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে না পারার গ্লানিতে ডুবে থাকা বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশিকেও মানতে হবে। মানতেই হবে করোনা আক্রান্ত ইতালিফেরত বাংলাদেশিদের বিনা পরীক্ষায় দেশে প্রবেশ করিয়ে, প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনে না রাখা ব্যর্থ মন্ত্রীদের। সেকালের বধূদের সংসারে মানিয়ে নাও পরামর্শের মতোন জাতিকে এই ব্যর্থ মন্ত্রীদের সংসারে মানিয়ে নিতে অলৌকিক পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে জনগণকে। সেই সঙ্গে পাবলিক সার্ভেন্ট বা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী সচিব ডিসিদের দাপটে থাকতে বলা হচ্ছে ক্ষমতার মালিক জনগণকে। মেনে নিতে বলা হচ্ছে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি মন্ত্রী এমপিকে। তারাও লজ্জা শরম হারিয়ে সচিবদের সমন্বয়ের নেতৃত্ব মেনে ধান কাটছেন। আর আমরা আমজনতা বলি বাঃ বাঃ শাবাশ। এমপি মন্ত্রী নেতা সমাজসেবী সবাই নিজেদের সামর্থ্যে গরিবের ঘরে খাবার পাঠান। সরকারি বা জনগণের টাকায় ত্রাণ দেন ডিসিরা, ইউএনওরা স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের দিয়ে! এখানে জেলার সমন্বয়ে আমলা আর মন্ত্রী এমপি ধান কাটা কামলা। আগামীতে জনগণের কাছে ক্ষমতায় থাকলে বা না থাকলেও জবাবদিহি বর্তমান মন্ত্রী এমপিদেরই করতে হবে। গণমানুষের দল আওয়ামী লীগকেই করতে হবে। সচিব ডিসিরা কী করবেন? নাকি জনতা তার প্রজাতন্ত্রের বেতনভুক কর্মচারীর কাছে চাইবেন? সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় এটা সংবিধানসম্মত কিনা সে প্রশ্ন তোলার সংসদও নেই, নেতাও নেই! মাঝখানে আমলাদের রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ বাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। অতিশয় অক্ষম বিএনপিও আবালের মতোন কথায় সরকারের সমালোচনা করে ত্রাণ ত্রাণ আহাজারিতে! এখানে দুর্বল উদাসীন। ছাত্রলীগ সারা দেশে জীবাণুনাশক ছিটিয়েছে, গ্লাভস, স্যানিটাইজার বিতরণ করেছে। কৃষকের ধান কেটে ঘরে তুলে দিয়েছে। লবণ চাষিদের পাশে দাঁড়িয়েছে। করোনায় মৃতের দাফন করেছে। অসাধারণ। করেছে। অনেকে নির্লজ্জের মতোন ধান কাটার সেলফিবাজি নাটক করেছে। মানুষ অত বোকা নয়। মন্ত্রী এমপি কর্মকর্তাদের এই দুঃসময়ে নাটক মানায় না। চিকিৎসা দেখুন, ত্রাণ বিতরণের খোঁজ নিন। তালিকা স্বচ্ছ হয়েছে? এখানে মানুষ পাবে, কারও সমর্থক নয়। সচিবরা জেলা সফর করছেন? মানুষ খাবার চায়, খাবার দিন। নয় বিক্ষোভ হবে। পুলিশ অসাধারণ পরিশ্রম করছে। র‌্যাব করছে। সেনা করছে। সরকারি কর্মচারী করছে। সবাই করছে। চিকিৎসকরাও। সবাই নাটক করে না, ফাঁকি দেয় না। নারায়ণগঞ্জের কাউন্সিলর খোরশেদ এখন নায়ক। সেলফি নাটক করেনি। ইবাদত করেছে। কেউ আসে না হিন্দুর শবযাত্রায়, সে-ই শেষকৃত্য করেছে। দুর্নীতিবাজ, ঘুষখোর, ব্যাংক, শেয়ার লুটেরা, অর্থ পাচারকারীরা নেই বিপদে। লুটেরা থাকে না। ওরা দেশদ্রোহী। মানুষ থাকে। ভিক্ষে করে ১০ হাজার টাকা জমানো গরিব ত্রাণ তহবিলে দেন। গরিব মুক্তিযোদ্ধা দেন। প্রধানমন্ত্রী তার খোঁজ নেন, সেসব লুটেরাই ভিখেরি, ভিখেরিই নায়ক। মানুষের পাশে আছে দেশপ্রেমিক শিল্প গ্রুপ।

শেখ হাসিনার প্রথম শাসনামলেও জাঁদরেল সিএসপি আমলা ও মুক্তিযোদ্ধা সরকারি কর্মকর্তার দাপট কর্তৃত্ব নেতৃত্ব নয়, জনগণের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি মন্ত্রী এমপিদের নেতৃত্বই দেখেছে ও মেনেছে মানুষ। তারা ছিলেন রাজনীতিবিদ। অথচ এখন প্রজাতন্ত্রের সুবিধাবাদী নব্য দলকানা পাবলিক সার্ভেন্টদের কর্তৃত্ব মানতে হচ্ছে। ডিসিদের স্যার ডাকা লোকদের মন্ত্রী বানালে এমন অবস্থা হয়। ব্যবসায়ীরা এমপি মন্ত্রী হয়ে বাণিজ্যে মনোযোগী হলে, নেতা-কর্মীরা দুর্নীতিতে জড়ালে, এমপিরা এলাকাকে অর্থনৈতিক সাম্রাজ্য বানিয়ে অর্থের নেশায় ডুবলে এমন হয়। রাজনীতি রাজনীতিবিদদের জন্য কঠিন ও হাতছাড়া হয়। তবু শিক্ষা হয় না। কেবল আদর্শিক নেতা-কর্মীর অন্তর পুড়ে ছাই হয়। মানুষের ক্ষমতা খর্ব হয়।

বাংলাদেশে করোনার থাবা বিস্তারে যে কটি কারণ তার একটি স্বাস্থ্য বিভাগের ও বিমানবন্দরকে অবাধে খুলে দেওয়ার ব্যর্থতা বলেছি। এর বাইরে মানুষের অসচেতনতা, সঙ্গে গার্মেন্ট মালিকদের হঠকারী সিদ্ধান্ত, কারখানা খুলে দেওয়া বড় কারণ। এখন তাদের কারণেই লকডাউন শিথিল হয়ে গেছে। এরা দেশে-বিদেশে বিপুল সম্পদ বিলাসবহুল জীবন গড়ে, জাতির দুর্দিনে ত্রাণ তহবিলে দান করে না, মাঝখানে রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষমতা দখলে নেয়। এক মাস বসিয়ে শ্রমিকদের সামান্য কয় টাকা মজুরিও দিতে পারে না। সরকারের কাছে হাত পেতে জনগণের টাকায় জাকাত নয়, প্রণোদনা নেয়। সব ঈদে বেতন-বোনাস দিতে বড় অনীহা! বিক্ষোভ সড়ক অবরোধ এই করোনাকালেও শুরু হয়েছে। এমন শোষণ বাণিজ্য আর কোনো খাতে নেই! করোনা পরিস্থিতিতে মার্চের বেতন পাননি প্রায় ৩৭ হাজার শ্রমিক। বিজিএমইএর মতে, বর্তমানে তাদের সদস্যভুক্ত ২ হাজার ২৭৪টি কারখানায় মোট ২৪ লাখ ৭২ হাজার ৪১৭ শ্রমিক কাজ করছেন। ২৩ এপ্রিল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত সময়ে ২ হাজার ২০০ কারখানার ২৪ লাখ ৩৫ হাজার ৪১৭ জন শ্রমিক মার্চের বেতন পেয়েছেন। অর্থাৎ এখন পর্যন্ত ৭৪টি কারখানার ৩৭ হাজার শ্রমিকের বেতন দেওয়া হয়নি। ২২ এপ্রিলের মধ্যে পাবে বললেও দেয়নি।

বাণিজ্যমন্ত্রীসহ অনেকে গার্মেন্ট ব্যবসায়ী। ঢাকার অর্ধেক নগরবাসীর ভবন ও একটি নির্বাচনী আসনও নিয়েছেন তারা। অথচ কর্মহীন মানুষের জন্য হাত খোলে না! এরা আনিস, দিস না দলের। সচিবদের প্রতি জেলার ত্রাণ সমন্বয়ের দায়িত্ব দেওয়ায় লিখেছিলাম ক্ষোভে, ভালোই! দায় তাদের নিতে হবে। ব্যর্থতার দায় রাজনীতিবিদদের কপালে কলঙ্কের তিলক হবে না। দলীয় করণের অভিযোগ আসবে না। অনেক পাঠক জানতে চেয়েছিলেন এটাই কি আমার একমাত্র কথা? কথা বললেই বাড়ে কথা। অনেক কথাই বলতে হয়। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দীর্ঘ সংগ্রাম দুর্ধর্ষ সাহসী নেতৃত্বে সীমাহীন ত্যাগে রক্তক্ষয়ী মহান মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম। জাতিকে এক মোহনায় এনে রাজনীতিবিদদের এক কথায় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সেই যুদ্ধ ও বিজয়। বঙ্গবন্ধুর মতোন অতুলনীয় দেশপ্রেমিক ও জনগণকে সীমাহীন ভালোবাসা এবং রাজনৈতিক কর্মীদের সম্মান রক্ষার মতোন নেতা পৃথিবীর ইতিহাসে দুর্লভ। এমন নির্লোভ সাহসী নেতা পৃথিবীতে শত বছরে আসেন না। আসবেন না। আমরা তাঁর প্রতি যে অপরাধ করেছিলাম তার চড়া মাশুল দিচ্ছে আজও দেশ।

বঙ্গবন্ধু যুদ্ধবিধ্বস্ত একটা স্বাধীন দেশকে ধ্বংসস্তূপ থেকে দাঁড়ই করাননি, ব্রিটিশ সংসদীয় মডেলের শাসনব্যবস্থা ও আদর্শ সংবিধান দিয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ধর্মনিরপেক্ষ উদার গণতান্ত্রিক শোষণমুক্ত সমাজের সমাজতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদী চরিত্র নির্ধারণ করেছিলেন। জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধির ক্ষমতা ও মর্যাদা সুরক্ষিত করেছিলেন উচ্চ আসনে। আমরা বিদেশি ষড়যন্ত্রে বিশ্বাসঘাতকতায় উগ্র হঠকারী পথে পিতাকে উৎখাতে নেমেছিলাম। কেউ অতিবিপ্লবের চীনা পথ। কেউ কার্যকর বিরোধী দলের ভূমিকা পালন না করে মস্কোর ঘণ্টা বাজিয়ে অনুগত মোসাহেবের ভূমিকায়! পরে দলের সাইনবোর্ড বিলুপ্ত করে একদলে! আরেক দল এসব অশান্ত অস্থির সুযোগে জাতীয় আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রে মানবসভ্যতার ইতিহাসের নৃশংসতায় পরিবার-পরিজনসহ জাতির পিতাকে হত্যা করেছি বিশ্বাসঘাতক হয়ে। তারপর সবাই যার যার পথে। সেনাশাসকদের খাল কাটা বিপ্লবেও গেছেন অনেকে। পরের নষ্ট রাজনীতি ও মিথ্যাচারের ইতিহাস সবার জানা।

আওয়ামী লীগকে একাই নির্যাতন ভোগ করে কঠিন পথের লড়াই করতে হয়েছে। পিতৃহত্যার প্রতিরোধ যোদ্ধা থেকে সেই সংগ্রামের বীর নায়ক ও যোদ্বারা পরে ছিটকে পড়েছেন। অথচ রাজনৈতিক দেউলিয়া গণবিচ্ছিন্ন সেই দুর্দিনের মুজিববিদ্বেষী কট্টরপন্থি আওয়ামী লীগবিরোধীরাও সেই সংগ্রামের বিজয়ী নায়ক বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার ছায়ায় আশ্রিত হন! গত ১১ বছরে সব পেশার সুবিধাবাদীরা ক্ষমতার করুণাশ্রিত হয়ে বড় আওয়ামী লীগ হয়ে গেছেন। যেন তারা অতীতে আর কোনো দল করেননি। ১১ বছর দাসের চরিত্রে খেয়ে হৃষ্টপুষ্ট হয়েছেন। বিপদ দেখলে ঠিক কেটে যাবেন সমালোচনার বাক্স খুলে। বিপদে লড়াই বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগকেই করতে হবে। কিন্তু ১১ বছরে দল কি আদৌ জনগণকে নিয়ে আদর্শিক নেতৃত্বে সুসংগঠিত হয়েছে? এ প্রশ্নের উত্তর নেতারা জানেন? ক্ষমতা চিরকালের মনে করলে ঘুমে আছেন।

আমাদের সামরিক শাসনবিরোধী তারুণ্যের যৌবনের সময়টাকে ছাত্ররাজনীতির শেষ আদর্শিক গৌরবকাল বলা যায়। আর সেনাশাসনমুক্ত গণতন্ত্রের নবযাত্রার বাংলাদেশে পেশাদারিত্বের রিপোর্টিং জীবনটাকে বড় আনন্দের সোনালি সময়ই মনে হয়। সেই গণতন্ত্র পরে সোনার হরিণ হয়ে গেল চোখের সামনে। স্মৃতিকাতর হওয়া মানুষের প্রকৃতিগত স্বভাব। আর অনুভূতিপ্রবণ মানুষের কাছে অতীত যত সংগ্রামের হোক সেই সময়টাই তত মধুর হয়ে যায়। বড় বর্ণাঢ্য মনে হয়। বড় দ্রুত সময় চলে যায়। সময় আর নদীর স্রোত কারও জন্য অপেক্ষা করে না। আমাদের সেই রাজনৈতিক ও সংসদ বিটের রিপোর্টিং জীবনের পঞ্চম সংসদে বিএনপির তথ্যমন্ত্রী ব্যারিস্টার নাজমুল হুদাকে বিরোধীদলীয় উপনেতা আবদুস সামাদ আজাদ বলেছিলেন ‘বেহুদা’। নাজমুল হুদার মন্তব্যে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সেই যে সংসদে বিরোধী দল ওয়াকআউট করেছিল সেটি পরে মাগুরার ভোট ডাকাতির নির্বাচনের প্রতিবাদে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে সংসদ থেকে পদত্যাগ ও গণঅভ্যুত্থানে পরিণতি ঘটে বিরোধী দলের দাবি আদায়ে। সেসব কালেও রাজনীতি ঊর্মিমুখর ছিল। রাজনীতিবিদদের সেন্স অব হিউমার ছিল। সামাদ আজাদ সাইফুর রহমানের সবাইকে আহত করার বক্তব্যের সমালোচনায় বলেছিলেন, আমি আরও ভাবলাম কোন ‘য়য়ফুর’! আবদুর রহমান বিশ্বাস স্পিকার হিসেবে ভালো করেননি। সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে সংসদ অধিবেশন কক্ষ থেকে বের করে দিতে সার্জেন্ট অ্যাট আর্মস তলব করেছিলেন। মাগরিবের বিরতির পর বিরোধী দলের নেতা শেখ হাসিনা প্রবেশ করেই হস্তক্ষেপ করে সামাল দেন। সংসদীয় রাজনীতিতে বিরোধী দলের নেতা কত শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান তা দেখার সৌভাগ্য হয়েছে। উপলব্ধি করেছি। এমপিদের কর্তৃত্ব ছিল। মর্যাদা ছিল। নেতাদের সমাজে প্রভাব ছিল। প্রধানমন্ত্রী ছিলেন বেগম খালেদা জিয়া। সংসদে উপস্থিতি ও কথা বলার আগ্রহ ছিল কম। রহমান বিশ্বাস প্রেসিডেন্ট হয়ে বঙ্গভবনে চলে গেলে শেখ রাজ্জাক আলী স্পিকার হয়ে বিরোধী দলেরও আস্থা অর্জন করে দক্ষতার সঙ্গে সংসদ চালান। সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী তাকে পাইকগাছার উকিলও বলেছিলেন। খালেদা জিয়া সংসদে কম কথা বলতেন তাই সুরঞ্জিত সেন, ‘গোলাপি এখন ট্রেনে’ সিনেমার নায়ক ফারুকের সংলাপ ‘একটা কথা কও গোলাপি একটা কথা কও’ বলে হাসির রোল তুলেছিলেন। এখন নায়ক ফারুক সংসদে, কিন্তু সংসদ পানসে! ব্যবসায়ী আছেন পার্লামেন্টারিয়ান নেই!

সেই সংসদে দুর্দান্ত ভূমিকা রাখেন তোফায়েল আহমেদ। বলা যায় সংসদীয় রাজনীতিতে সেই সংসদে ছিল তাঁর জীবনের সেরা পারফরম্যান্স। বিএনপির মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে বিশেষ করে পানিসম্পদমন্ত্রী জেনারেল মজিদ উল হকের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনে সরকারকে প্রবল ঝাঁকুনি দিয়েছিলেন। রাজনীতি রাজনীতিবিদদের হাতে ছিল। রাজনীতিতে সব গণমুখী দীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রামে পোড় খাওয়া অভিজ্ঞ জনগণের আস্থা ভালোবাসায় থাকা দাপুটে নেতারা ছিলেন। সংসদ ছিল তর্কে-বিতর্কে ওয়াকআউটে বর্জনে আলোচিত প্রাণবন্ত। শেখ হাসিনা স্বভাবসুলভ অকপটে কথা যেমন বলতেন, তেমনি এক রাষ্ট্রপতিকে ‘চার্লি চ্যাপলিন’ আরেক রাষ্ট্রপতিকে ‘মিস্টার জোকার’ বলে সেন্স অব হিউমার ছড়িয়েছেন। মিজানুর রহমান চৌধুরীর মতোন পার্লামেন্টারিয়ান, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, রাশেদ খান মেননরা মিলে ছিলেন প্রাণবন্ত।

এখন রাজনীতি রাজনীতিবিদদের হাতে নেই। গণতন্ত্রের সংজ্ঞা বদলে গেছে। নির্বাচনের চিরচেনা চেহারা পাল্টে গেছে। রাজনীতিবিদরা মরে গেছেন। জীবিতরা বেঁচে আছেন বলে রাজনীতি করেন। তাদেরও কোয়ারেন্টাইনে পাঠানো হয়েছে। আদর্শবানরা তো আইসোলেশনে সেই কবে থেকে। এখন একদল রাজনীতিবিদ পয়দা হয়েছেন যাদের নাম-পরিচয় বারবার বললে মানুষের মনে থাকে না। মনে ধরে না। এরা হঠাৎ নেতা হঠাৎ এমপি হঠাৎ মন্ত্রী! রাজনীতিকে এই ভয়ঙ্কর করোনাভাইরাস শেষ করে দিয়েছে। এটা দেশপ্রেমিক জাতীয়তাবাদী শক্তিকে শেষ করার আন্তর্জাতিক ব্লুপ্রিন্টের ধারায় ঘটেছে। সামরিক শাসনের কবলমুক্ত গণতন্ত্রের নবযাত্রা হেলেদুলে যা-ও আশার আলোয় চলছিল বিএনপি-জামায়াত শাসনামলের পাপাচার প্রতিহিংসার গ্রেনেড বোমা সন্ত্রাস কফিনে শেষ পেরেক ঠুকেছে। সামরিকতন্ত্র ও ওয়ান-ইলেভেনের সুশীলতন্ত্রমুক্ত গণতন্ত্র না আবার আমলাতন্ত্রের গর্তে প্রবেশ করে সেটা আওয়ামী লীগকেই সতর্ক হতে হবে। রাজনীতিবিদদের আত্মসমালোচনায় আত্মশুদ্ধিতেই লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে।সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন।

লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন।