আমাদের অস্তিত্ব, শুন্যস্থান, স্বপ্ন সবকিছু জুড়ে বাবা তোমার বসবাস

0 ১৫৫

১৯৯৬ সালের আজকের দিনে তোমার সাথে কাটানো জীবনের শেষ দিন। যখনই তোমাকে নিয়ে লিখতে যাই, চেষ্টা করেও নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না, ঝাপসা হয়ে ওঠে গোটা পৃথিবী। আবার এমনও হয়, কোথা থেকে শুরু করবো সেটাই বুঝে উঠতে পারি না, কেননা তোমাকে নিয়ে লিখতে বসলে সারাজীবন লিখতে পারবো। আমার/আমাদের অস্তিত্ব, শুন্যস্থান, স্বপ্ন সবকিছু জুড়ে তোমার বসবাস। স্বপ্নরাজ্যের বাসিন্দাও কেবল তুমিই, বাবা। কেমন এলোমেলো ভাবেই মনে পড়ে সেই বর্ষার দিনে তোমার চলে যাওয়া। সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে তোমার সেই ভরাট কন্ঠে গেয়ে ওঠা গান”রিমঝিম রিমঝিম নামিলো দেয়া ফুটিলো কদমফুল ফুটিলো কেয়া”। “রিমি” তোমার ছোট মেয়ে,যখন খুব ছোট্ট কিছু না বুঝেই কান্না শুরু করতো। আমরা হাসাহাসি করতাম। ওর কান্না দেখে তুমি আবারও গেঁয়ে উঠতে,”যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে”। মানে বুঝিয়ে বললে ওর কান্না থামতো। তুমি ওর কান্না থামাতেই বলতে তুই আমার “মা” ওরা সব “খালা”। ও খুব মজা পেত। সেই বোকা বোকা রিমি’টা আজ কতই না বুদ্ধিদীপ্ত। মাঝে মাঝে সকালে একসাথে খেতে বসলে,বলতে কী যে খাস তোরা,চঁড়ুই পাখির আধার। তোর মায়ের মুরগীর বাচ্চাগুলোও এর থেকে বেশি খায়। খেতে বসে তুমি খাওয়া শেষে আঙ্গুল চেটে খেতে, আমরা তোমায় একটু ভয় পেলেও সুমি তোমার কাছাকাছি বেশি থাকতো,একটু মুখরা বলেই ও বলতো আব্বু তুমি শব্দ করে খাও কেন ? তুমি বলতে,আল্লার নিয়ামত খাচ্ছি,খাওয়ার মজা না নিলে,আল্লার শোকর আদায় হয় না “মা”। তোমার প্রিয় লাইব্রেরীতে এখন আর কেউ পড়তে বসে না। ওখানে তোমার প্রিয় বইগুলো পড়ে আছে। ঋৎববফড়স ড়ভ সরফহরমযঃ, ঋৎববফড়স ড়ভ ওহফরধ, ঋধপঃং ধহফ উড়পঁসবহঃং. রবীন্দ্র, নজরুল সবই পড়ে আছে বাবা। ওখানে দাঁড়ালে তোমার সেই মধুর কন্ঠে কোরআন তেলাওয়াত আজও ভেসে আসে সুরা মূলক, আর-রহমান। বারবার প্রতিধ্বনিত হয় ফালি আইয়্যি আ-লা-য়ি রাব্বীকুমা-তুকায্যিবা-ন্। নিজ ধর্ম পালনে তুমি ছিলে পুরোপুরি অনুগত। সেইসাথে তোমার অধ্যবসায়ের তালিকায় অন্য ধর্মগ্রন্থও বাদ পড়েনি। পবিত্র গীতা,বাইবেল, ত্রিপিটক সবই শ্রদ্ধার সাথে অধ্যয়ন করতে। আমাদের বলতে,অন্য ধর্মের প্রতি সম্মান না জানালে নিজ ধর্মের জ্ঞান বাড়ে না “মা”। আজ আর সে’দিন নেই,বাবা। প্রাতিষ্ঠানিক কোন শিক্ষা না থাকলেও কখনো কখনো কত চমৎকার ছন্দে তুমি রবীন্দ্র,নজরুল সংগীত গেয়ে উঠতে। আবহাওয়া অনুযায়ী তুমি গান,দরাজ কন্ঠে কবিতা আবৃত্তি করতে। এমনি কত জীবন্ত স্মৃতি এলোমেলো হয়ে প্রতি মুহূর্ত বুকের ভেতরকে দুমড়ে মুচড়ে এলোমেলো করে দেয় জীবনকে। জীবনের পরখে পরখে তোমারই নাম। তুমি আছো ভোরের মিষ্টি বাতাসে,উদিত সূর্যকিরণে,অধিকার আদায়ের মিছিলে,জাতীয় সংগীতে,এক সাগর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতায়,মেঠো পথে,যেখানে লাখো জনতা আজও তোমার পদচিহ্ন খুঁজে ফেরে। ওপারে ভালো থেকো বাবা,যেমনটি আজও আছো সাধারণ মানুষের কাছে।

সূত্র: লায়লা পারভীন সেঁজুতির ফেসবুক ওয়াল থেকে সংগৃহীত।


error: Content is protected !!