কলারোয়ায় অযত্ন-অবহেলায় পড়ে আছে কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিস্তম্ভ

0 ৫২

মাসুদুর রহমান মাসুদ, কলারোয়া থেকে ফিরে: এখন ফেব্রুয়ারী মাস, ভাষার মাস। ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে বাঙালি জাতি অর্জন করেছিল তাদের মাতৃভাষা বাংলার অধিকার। এ অধিকার আদায়ে আত্মাহুতি দিয়েছিল শহিদ রফিক, শফিউর, সালাম, বরকত, জব্বার সহ নাম না জানা আরও অনেকেই। সেই সব ভাষা শহিদের স্মরনে রাখার জন্য নির্মিত হয়েছিল শহিদ মিনার। প্রতি বছর ফেব্রুয়ারী মাস আসলেই শুরু হয় ভাষার মাস। এ মাস ব্যাপি বিশেষ করে একুশে ফেব্রুয়ারী তারিখে বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে স্মরণ করা হয় ভাষা শহিদদের।

আর ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত হয়েছিল আমাদের স্বাধীনতা। স্বাধীনতা যুদ্ধের অসংখ্য মানুষ শহিদ হয়েছে। স্বাধীনতা যুদ্ধে আত্মাহুতি দেয়া শহিদদের স্মরনে নির্মিত হয় মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিস্তম্ভ। সারা বাংলাদেশ ব্যাপি বিভিন্ন জায়গায় রয়েছে অসংখ্য শহিদ মিনার ও স্মৃতিসৌধ। এমনই একটি শহিদ মিনার ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিস্তম্ভ নির্মিত হয় সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলা সদরে।

কলারোয়া উপজেলা পরিষদের সম্মুখভাগে যশোর-সাতক্ষীরা প্রধান সড়কের বিপরীত পাশে অবস্থিত  কলারোয়া কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিস্তম্ভ “স্বাধীনতা”। কলারোয়া জি,কে,এম,কে পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মাঠের একপাশে একই জায়গায় পাশাপাশি অবস্থিত এ দু’টি স্মৃতিচিহ্ন পড়ে আছে চরম অযতœ আর অবহেলায়। এখানকার অবস্থা দেখলে মনে হবে যেন এটা দেখার কেউ নেই।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মুক্তিযোদ্ধা মিজানুর রহমান এর মূল পরিকল্পনা, অর্থায়ন ও বাস্তবায়নে কলারোয়া কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার ও মুক্তিযুদ্ধের বিজয় স্তম্ভ “স্বাধীনতা” এর নির্মান কাজ শুরু হয় বাংলা ১৪০৭ সনের ১ লা বৈশাখে। একই বছরের ৩০শে চৈত্র এর নির্মাণ কাজ শেষ হয়। মোটা অঙ্কের অর্থ খরচ করে নির্মিত এ বিজয় স্তম্ভটির উদ্বোধন করা হয় ইংরেজি ২০০১ সালের ৬ জুলাই তারিখে। তৎকালীন সরকারের বানিজ্যমন্ত্রী আব্দুল জলিল এটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন।

৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধে কলারোয়া থানার সংগঠকরা হলেন ভাষা সৈনিক শেখ আমানুল্লাহ, মমতাজ আহমেদ এমসিএ ও বিএম নজরুল ইসলাম এমপি। “স্বাধীনতা” এর ভাস্কর হিসেবে ছিলেন শিল্পী দুলাল চন্দ্র গাইন, শিল্পী বিবেকানন্দ রায় ও শিল্পী স্বপন কুমার পাল। এটি নির্মাণে সার্বিক সহযোগিতা করেন মোসলেম উদ্দীন, গোলাম মোস্তফা, শেখ কামাল রেজা ও অসীম কুমার সোম। ইটি নির্মানের ফলে কৃতজ্ঞতা স্বীকার করেছেন কলারোয়া পাইলট হাইস্কুলের ম্যানেজিং কমিটির সদস্যবৃন্দ, কলারোয়া মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ও কলারোয়া পাবলিক ইনস্টিটিউট।

তথ্যানুসন্ধানে জানা যায় কলারোয়া থানার বীর মুক্তিযোদ্ধা কেড়াগাছি গ্রামের হারুনর রশিদ ও মোসলেম আলী হাজরা, আটুলিয়ার সরদার আনছার আলী, পূর্বকোটার সাবুর আলী, দার বকস, বোয়ালিয়ার আব্দুল মালেক ও জাহেদ আলী, চন্দনপুরের তমেজ উদ্দীন ও হযরত আলী, বেড়বাড়ির আব্দার রহমান, দেয়াড়ার শওকত খান, মোজাফফার হোসেন ও আব্দুল জব্বার, তুলশিডাঙ্গার আজিবর রহমান, শুভংকরকাটির শেখ তৌফিকুর রহমান, কাশিয়াডাঙ্গার শাহজাহান আলী ও আলী আহম্মেদ, লোহাকুড়ার স. ম হাবিবুর রহমান এবং যুগিখালির আনিছ উদ্দীন সহ আরও অনেকেই ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহন করেন।

এছাড়া মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহন করে এ উপজেলার যারা শহিদ হয়েছেন তারা হলেন কাউরিয়া গ্রামের শহিদ আবু বক্কর ও শহিদ হাফিজ, কেরালকাতার শহিদ নূর মোহাম্মাদ, খোরদো’র শহিদ সোহরাফ হোসেন, বাগাডাঙ্গার শহিদ ইমাদুল হক ও বৈদ্যপুরের শহিদ যাকারিয়া।  এছাড়াও নাম না জানা আর অনেক মুক্তিযোদ্ধা ও শহিদ মুক্তিযোদ্ধা থাকতে পারে বলে স্থানীয় অনেকের অভিমত।

এসব মুক্তিযোদ্ধা ও শহিদ মুক্তিযোদ্ধা এবং ৫২’র ভাষা শহিদদের স্মরনে কলারোয়ায় শহিদ মিনার ও স্মৃতিস্তম্ভ “স্বাধীনতা” নির্মিত হলেও প্রায় সারা বছরই এটি পড়ে থাকে চরম অবহেলা আর অযতেœ। এর দু’দিকে লোহার রেলিং আর এক দিকে মার্কেটের পাকা দেয়াল থাকলেও সামনের পাশ রয়েছে একেবারেই আলগা। যশোর- সাতক্ষীরা প্রধান সড়কের পাশে অবস্থিত হওয়াতে প্রতিদিনকার রাস্তার ধূলাবালিতে ভরে গেছে এটি। দেখার তথা পরিস্কার পরিচ্ছন্ন করার কেউ না থাকায় এর স্বাভাবিক সৌন্দর্য্য অনেকটা বিলীন হয়ে গেছে। ধূলা বালির প্রলেপ পড়তে পড়তে এর নামফলক আর বিবরনী চার্ট এমন বিবর্ন রুপ ধারণ করেছে যে এর উপরের লেখাগুলোও ঠিকমতো পড়া যায় না এখন। এছাড়া গাছের পাতা, কাগজ, ইট-খোয়া, আর অন্যান্য আবর্জনায় ভরে গেছে এর চারপাশ। দিনের সুবিধামতো সময়ে আর সন্ধ্যার পর থেকে এর সামন্য সামনে ও মার্কেটের দেয়ালের পাশেই প্রসাবও কওে থাকে অসচেতন অনেকেই। যার দূর্গন্ধে এই স্মৃতিস্তম্ভের পাশে দাঁড়াতে পারে না দর্শনার্থী কেউ। অথচ এর ঠিক পাশেই মার্কেটের দেয়ালে অঙ্কিত হয়ে আছে মহানুভবতার দেয়াল। মহানুভবতার দেয়াল রয়েছে কিন্তু মহানুভব মানুষ যেন এখানে নেই, নেই এ দু’টি স্মৃতিস্তম্ভ পরিস্কার পরিচ্ছন্ন করে রাখার লোক। অথচ কলারোয়া উপজেলা শহর ও পৌরসভার মধ্যেই এটি অবস্থিত।

স্থানীয়রা বলছেন, কলারোয়া উপজেলা পরিষদ, উপজেলা প্রশাসন, কলারোয়া পৌরসভা ও কলারোয়া পাইলট হাইস্কুলের এমন কোন দায়িত্বশীল ব্যক্তি বোধ হয় নেই যার উদ্যোগে এটি সংরক্ষণ ও পরিস্কার পরিচ্ছন্ন করে রাখা যায়।

স্থানীয়রা আরও বলেন, প্রতি বছর ২১ ফেব্রুয়ারী ও ২৬ মার্চ  আসলেই তার আগের দিন এটি একটু পরিস্কার পরিচ্ছন্ন করা হয় এ স্মৃতিস্তম্ভ। কিন্তু ঐ দিবস গেলেই এর দিকে আর খেয়াল থাকেনা কারোরই। প্রতিনিয়ত গরু-ছাগল উঠে থাকে এর উপর। অনেককেই আবার জুতা স্যান্ডেল পায়ে দিয়ে এর উপরে উঠতে দেখা যায়। আর এর সামনে ও মার্কেটের দেয়াল ঘেষে আমজনতা প্রতিনিয়ত প্রসাব করে থাকে। যার দূর্গন্ধে এর আশপাশে যেয়ে কোন মানুষ দাঁড়াতে পারে না।

কথায় বলে, “স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে, স্বাধীনতা রক্ষা করা কঠিন”- এ যেন ঠিক তেমনই। ভাষা শহিদ ও মুক্তিযুদ্ধের শহিদদের স্মরনে কলারোয়ায় স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়েছে কিন্তু এর রক্ষানাবেক্ষণ করা হচ্ছে না ঠিকমতো। আর এভাবে থাকতে দেয়াটা শহিদদের প্রতি অনেকটা অবহেলারই শামিল বলা যায়। তাই গুরুত্বপূর্ন এ স্মৃতিস্তম্ভের রক্ষণাবেক্ষনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি কামনা করেছেন কলারোয়ার দেশপ্রেমিক সচেতনমহল।

এ ব্যাপারে কলারোয়া পৌরসভার দীর্ঘদিনের ভারপ্রাপ্ত মেয়র ও সদ্য নির্বাচিত পৌর মেয়র মনিরুজ্জামান বুলবুল সাতনদীকে বলেন, “এটার রক্ষনাবেক্ষণ করা আমাদেও অবশ্যই উচিৎ। প্রায় প্রতিদিন এলাকার ছেলেরা এখানে যেয়ে বাদাম, খেয়ে অপরিচ্ছন্ন করে, এমনকি অনেক সময় অনেকে জুতা স্যান্ডেল পায়েও এর উপরে উঠে থাকে। আমরা পৌরসভার পক্ষ থেকে এটি পরিস্কার পরিচ্ছন্ন করে থাকি। পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা অনেক সময় ব্যস্ত থাকে, তাছাড়া সদ্য সমাপ্ত কলারোয়া পৌরসভা নির্বাচনের কারনে ব্যস্ত থাকায় এটির দিকে খেয়াল রাখা সম্ভব হয়নি। এ ব্যাপারে পৌরসভার পক্ষ থেকে অবশ্যই ব্যবস্থা নেয়া হবে।”

প্রসঙ্গত: শুধু কলারোয়াতেই নয়, জেলার অন্যান্য উপজেলা ও বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অবস্থিত অন্যান্য অধিকাংশ শহিদ মিনার ও স্মৃতিসৌধের অবস্থাও অনুরুপ। তাই জেলাব্যাপি এ স্মৃতিস্তম্ভ সমুহের রক্ষানাবেক্ষণ ও পরিস্কার পরিচ্ছন্নতায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে স্ব স্ব কর্তৃপক্ষ সহ প্রশাসনের কর্তা ব্যক্তিদের আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন সচেতনমহল।