ডিডি মনিরুলের মাসিক উপরি কামাই সোয়া কোটি টাকা

0 ৯৬৪

অবৈধ বানিজ্যের খাত সমূহ-
* বাংলাদেশী ট্রাক প্রবেশ;
* ইন্ডিয়ান গাড়ী আনলোড ;
* গাড়ী পার্কিং;
* নাইট চার্জ;
* নিজস্ব গোডাউনে আনলোড;
* কোয়ারেন্টাইন ছাড়াই
গাড়ী ছাড়;
* অতিরিক্ত লোডিং চার্জ;
* বিল অব এন্ট্রি

 

নিজস্ব প্রতিবেদক: সাতক্ষীরার ভোমরা স্থল বন্দর এর উপ-পরিচালক মনিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে লক্ষ লক্ষ টাকা অবৈধ অর্থ বানিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। পন্য নেয়ার জন্য বন্দরে বাংলাদেশী ট্রাক প্রবেশ বাবদ, বন্দরে গাড়ী পার্কিং বাবদ, নাইট চার্জ বাবদ, ইন্ডিয়ান গাড়ী মালামাল আনলোড করে ফেরার সময় খালি গাড়ী বাবদ, বন্দরের বাইরে নিজস্ব গোডাউনে মালামাল আনলোড বাবদ, কোয়ারেন্টাইন ছাড়াই মালামালের গাড়ী ছাড় করে দেয়া বাবদ, বিল অব এন্ট্রি বাবদ এবং অতিরিক্ত লোডিং চার্জ সহতার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অংকের অবৈধ অর্থ আদায় করার অভিযোগ করেছেন বন্দর সংশ্লিষ্টরা। বন্দরের চেয়ারম্যানের নামে মনিরুলের এই অর্থ বাণিজ্য করে বলে প্রচার আছে। এছাড়া দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত বখশিস প্রথা বন্ধ করায় গত দু’দিন যাবৎ লেবারদের কাজ না করার কারনে বন্দরে অচালবস্থা সৃষ্টি হলেও তা নিরসনের আশু কোন ব্যবস্থা না করা সহ নানবিধ অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, ১৯৯৬ সালের জুলাই মাসে সাতক্ষীরার ভোমরা স্থল বন্দরটি চালু হয়। জননেত্রী শেখ হাসিনার ঘোষনা অনুযায়ী এটি একটি পূর্নাঙ্গ বন্দরে রুপান্তরিত হয়। বাংলাদেশে অর্থনীতিতে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। ভোমরা স্থলবন্দরে প্রত্যক্ষভাবে প্রায় ৫০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু কিছু দুর্নীতিগ্রস্থ কর্মকর্তা সুকৌশলে প্রতি মাসে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। বন্দরের এই দূর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার কারনে দেশের দক্ষিন-পশ্চিমাঞ্চলের একমাত্র সম্ভাবনাময় এ বন্দরটি হুমকির মুখে রয়েছে।
বন্দরের শ্রমিক, শ্রমিক নেতা, আমদানি রপ্তানী কারক, সিএন্ড এফ কর্মচারী এ্যাসোসিয়েশন নের্তৃবৃন্দ সহ বন্দরের সাথে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যক্তির অভিযোগ, পন্য নেয়ার জন্য বন্দরে বাংলাদেশী ট্রাক প্রবেশ বাবদ, বন্দরে গাড়ী পার্কিং বাবদ, নাইট চার্জ বাবদ, ইন্ডিয়ান গাড়ী মালামাল আনলোড করে ফেরার সময় খালি গাড়ী বাবদ, বন্দরের বাইরে নিজস্ব গোডাউনে মালামাল আনলোড বাবদ, কোয়ারেন্টাইন ছাড়াই মালামালের গাড়ী ছাড় করে দেয়া বাবদ এবং অতিরিক্ত লোডিং চার্জ সহ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বিভিন্ন অংকের অবৈদ অর্থ আদায় করে থাকে বন্দরের উপ-পরিচালক মনিরুল ইসলাম।
তারা বলেন, বন্দরে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩০০ ট্রাক প্রবেশ করে থাকে। আবার ভারতীয় ট্রাক বাংলাদেশী ট্রাকের তুলনায় বড় হওয়ায় ভারতীয় একটি ট্রাকের মালামাল নেয়ার জন্য বাংলাদেশী দু’টি ট্রাকের প্রয়োজন পড়ে। অভিযোগে তারা বলেন, পন্য নেয়ার জন্য বন্দর ইয়ার্ডে বাংলাদেশী কোন ট্রাক প্রবেশ করলে বন্দরের উপ-পরিচালককে ট্রাক প্রতি ১০০ টাকা দিতে হয়। সে হিসেবে ৩০০*২ = ৬০০ বাংলাদেশী ট্রাক বন্দরে ঢোকে। সে হিসেবে প্রতিদিন (৬০০*১০০)= ৬০,০০০/= অবৈধ ঘুষ দিতে হয় ডিডিকে। আবার প্রতিদিন বন্দরে প্রবেশ করা প্রায় ৩০০ ভারতীয় ট্রাকের প্রতিটি থেকে ভারতীয় ২০ রুপী আদায় করে থাকে ডিডি। প্রতি রুপী ৮০ থেকে ৮৫ টাকা হলে বাংলাদেশী টাকায় তা প্রায় ৪৮,০০০/= টাকা আদায় করে থাকে ডিডি।
তারা বলেন, বন্দরে গাড়ী পার্কিং বাবদ গাড়ী প্রতি ১০০ টাকা চার্জ দিতে হয়। যার কোন রশিদ সরবরাহ করা হয় না। প্রতি রাতে ১০০ গাড়ী নাইট হোল্ড করলে সেখান থেকে ১০ হাজার টাকা অবেধ আয় করেন ডিডি। আবার কেউ কেউ অভিযোগ করে বলেন, নাইট হোল্ড করার জন্য ভারতীয় গাড়ীগুলো সাধারনত রাত ৯ টায় বন্দরে ঢুকে থাকে। অথচ নাইট চার্জের সময় সন্ধ্যা ৬ টা থেকে ধরা হয়। আর নাইট চার্জ টন প্রতি ৬০ টাকা। এক্ষেত্রে তিন ঘন্টার অতিরিক্ত চার্জ নেয়া হয়। আবার ক্ষেত্র বিশেষ নাইট চার্জ হিসেবে ট্রাক প্রতি ৭০০ টাকাও নেয়া হয়। প্রতিদিন গড়ে ৫০টি ট্রাক থাকলে সেখান থেকে প্রায় ৩৫ হাজার টাকা অবৈধ আয় হয়। এসবের কোন রশিদ সরবরাহ করা হয় না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বন্দর সংশ্লিষ্ট এক ব্যক্তি বলেন, বন্দরে প্রতিটি ইন্ডিয়ান গাড়ী ঢোকার সময় কোন টাকা দিতে হয় না কিন্তু মালামাল আনলোড করে ফেরার সময় প্রতিটি খালি গাড়ী বাবদ ২০ রুপী করে দিতে হয়। সে হিসেবে প্রতিদিন ১০০ ভারতীয় গাড়ী আনলোড হলে সেখান থেকে বাংলাদেশী টাকায় প্রায় ১,৬০,০০০ টাকা ইনকাম হয়। বাড়তি এসব খরচের কারনে আমদানীকারকরা মালামাল আমদানী কাজে অনাগ্রহী হয়ে পড়েছে। ফলে বন্দর, বন্দরের শ্রমিক সবারই ক্ষতি হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক আমদানীকারক বলেন, ভারতীয় গাড়ী বন্দরে ঢুকে বন্দরের বাইরে আমদানী কারকের নিজস্ব গোডাউনে মালামাল (পেয়াজ, হলুদ, চাউল জাতীয় পন্য) আনলোড করতে চাইলে এর জন্য ডিডিকে ট্রাক প্রতি ১৫০০ টাকা উপরি দিতে হয়। গড়ে প্রতিদিন ৫০টি গাড়ী নিজস্ব গোডাউনে আনলোড হয়। সে হিসেবে সেখান থেকে প্রতিদিন ৭৫,০০০ টাকা অবৈধ আয় হয়।
অভিযোগে আরও জানা গেছে, কোয়ারেন্টাইন সংশ্লিষ্ট অফিসাররা চলে গেলে কোয়ারেন্টাইন ছাড়াই মালামালের গাড়ী ছাড় করে দেন ডিডি। আর এর জন্য ডিডি গাড়ী প্রতি ২ হাজার টাকা করে উৎকোচ গ্রহণ করে থাকেন। প্রতিদিন প্রায় ২০/৩০টি করে গাড়ী এভাবে ছাড় করা হয়। ফলে সেখান থেকে প্রতিদিন প্রায় ৫০ হাজার টাকা অবৈধ আয় হয়।
আরও অভিযোগ উঠেছে, এই বন্দরে অতিরিক্ত লোডিং চার্জ গ্রহন করা হয়। সংশ্লিষ্টরা বলেন, বেনাপোল বন্দরে যেখানে লোডিং চার্জ ৪১ টাকা, ভোমরা বন্দওে সেখানে ৬০.৩০ টাকা করে চার্জ নেয়া হয়। এই অতিরিক্ত লোডিং চার্জ কোথায় যায়, কার পকেটে যায় তার কোন হিসেব নেই।
এছাড়াও প্রতি বিল অব এন্ট্রি বাবদ ৩০০ টাকা ঘুষ আদায় করা হয়। প্রতিদিন গড়ে ৬০ থেকে ৭০টি বিল অব এন্ট্রি হয়ে থাকে।
সংশ্লিষ্টরা অভিযোগ করছেন অন্যান্যদের সহায়তায় এভাবে বিভিন্ন খাত থেকে উপ-পরিচালক প্রতিদিন ৪ লক্ষাধিক টাকা হারে মাসে কোটি টাকারও বেশি অবৈধ ইনকাম করে থাকেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যক্তি বলেন, বন্দরের উপ-পরিচালক বিভিন্ন খাত থেকে নানা কলা কৌশলে লক্ষ লক্ষ টাকা অবৈধ অর্থ বানিজ্য করে চলেছেন। বন্দরের এডি মাহমুদুল ইসলাম, হিসাব রক্ষক আব্দুল হান্নান, প্রধান অফিস সহকারী আমিনুল ইসলাম সহ বন্দরের অন্যান্য কর্মকর্তাদের যোগ সাজসে তিনি এই অবৈধ ইনকাম করে থাকেন এবং তাদের প্রত্যেকেই এই অবৈধ ইনকামের ভাগ পেয়ে থাকেন। তাই দিনের দিন পুকুর চুরি হলেও কেউ টু শব্দটি পর্যন্ত করেন না।
এই অবৈধ অর্থ বানিজ্যের অভিযোগের বিষয়ে ভোমরা স্থল বন্দরের উপ-পরিচালক মনিরুল ইসলামের বক্তব্য জানতে তার মোবাইল ফোনে দফায় দফায় ফোন করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরে এ ব্যাপারে তাকে ক্ষধে বার্তা পাঠানো হলেও তার পক্ষ থেকে প্রতিউত্তর জানা যায়নি।
এদিকে বন্দরে ডাবল লেবার চার্জ কার্যকরী করতে চাচ্ছে কর্তৃপক্ষ। কিন্তু সিএন্ডএফ এতে আপত্তি করছে। তারা বলেন, আমরা আনলোডিং চার্জ দিচ্ছি, তাহলে আবার কেন লোডিং চার্জ দেব ? আর এই নিয়ে গত দু’দিন ধরে বন্দরে চলছে অচলাবস্থা। গত দু’দিন বন্দরের শ্রমিকরা কর্মবিরতি পালন করছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নিজেদের দাবী পূরন না হওয়ায় তারা শুয়ে বসে অলস সময় পার করছে। দলনেতা আরিফুল সহ শ্রমিক শহিদুল প্রমুখ জানায়, এক দিন পর পর কাজ পাই, সে হিসেবে মাসে ১৫ দিন কাজ পাই। প্রতিদিন মুজুরী পাই ৩০০ টাকা। অর্থাৎ ১৫* ৩০০= ৪৫০০ টাকা আয় হয় তা দিয়ে সংসার চলে না। তাই আমরা মুজুরী বেশী পাওয়ার দাবীতে কর্মবিরতি দিয়েছি। শ্রমিকরা বলছে, আমরা গায়ে খেটে ৩০০ টাকা মুজুরী পাই। অথচ বন্দরের উপ-পরিচালক চেয়ারে বসে লক্ষ লক্ষ টাকা অবৈধ ইনকাম করছে। আর এই ইনকামের ভাগ পাচ্ছে বন্দর কর্তৃপক্ষের অন্যান্যরা।
এদিকে বন্দরের নানা অনিয়ম ও অচলাবস্থা দূর করা সহ বিভিন্ন দাবীতে রবিবার সাতক্ষীরা প্রেসক্লাবে সাংবাদিক সম্মেলন করে ভোমরা স্থল বন্দর আমদানী ও রপ্তানীকারক এ্যাসোসিয়েশন।
এমতাবস্থায় সাতক্ষীরার সম্ভাবনাময় এই বন্দরকে রক্ষায় বিষয়গুলোর সুষ্ঠ তদন্ত পূর্বক অবৈধ অর্থ বানিজ্য দূর কওে বন্দরের কাজে গতিশীলতা আনতে কার্যকরী ব্যবস্থা নিতে প্রশাসন ও বন্দর সংশ্লিষ্ঠ উর্দ্ধতন কর্মকর্তাদের আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন ভূক্তভোগীরা।