মণিরামপুরের পাঁচ সূর্য সন্তানের শাহাদাৎ বার্ষিকী, অবহেলায় পড়ে আছে বধ্যভ‚মি, নেই রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ

0 ৭২

আতিয়ার রহমান, মণিরামপুর থেকে: মণিরামপুরের ৫ সূর্য সন্তানের ৪৯তম শাহাদাৎ বার্ষিকী আজ ২৩ অক্টোবর শুক্রবার। ১৯৭১ সালের এই দিনে এদেশের স্বাধীনতাকামী পাঁচ সূর্যসন্তান মাশিকুর রহমান তোজো, আসাদুজ্জামান আসাদ, সিরাজুল ইসলাম শান্তি, আহসান উদ্দীন খান মানিক ও ফজলুর রহমান ফজলু পাকহানাদার বাহিনীর নির্মম নির্যাতনে শহীদ হন। যশোর জেলা শহর থেকে ৩০ কিলোমিটার দক্ষিণে কেশবপুর সড়কের চিনাটোলা বাজারের পূর্বপাশে ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধচলাকালে ২৩ অক্টোবর সকালে নির্মম হত্যার শিকার হন যশোরের এ ৫ সূর্য সন্তান। কিন্তু স্বাধীনতার ৪৯ বছর পেরিয়ে গেলেও এ শহীদদের স্মৃতি রক্ষার্থে রাষ্ট্রীয়ভাবে কোন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি।
এদিন শহীদ হওয়া ৫ জনের মধ্যে মাশিকুর রহমান তোজো ১৯৬১ সালে গণিত ও পদার্থ বিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি এবং ১৯৬২ সালে এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৬৩ সালে তিনি লন্ডন থেকে একচুয়ারি ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন। ১৯৬৯ এ লন্ডন থেকে দেশে ফিরে কৃষকদের মধ্যে কাজ করা শুরু করেন তিনি। তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টির একনিষ্ঠ কর্মী ছিলেন।
শহীদ আসাদুজ্জামান আসাদ ছিলেন যশোর এমএম কলেজের ভিপি; ছাত্র ইউনিয়ন মেনন গ্রæপের নেতা। ১৯৬৯’র গণঅভ্যুত্থানের সময় ছাত্রদের ১১ দফা আন্দোলনের সর্বদলীয় ছাত্র সংগঠনের আহবায়কও ছিলেন আসাদ।
সিরাজুল ইসলাম শান্তি ছিলেন জেলা কৃষক সমিতির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক। আর আহসান উদ্দীন খান মানিক ছিলেন ছাত্র ইউনিয়ন মেনন গ্রæপের জেলা শাখার সভাপতি। এরা সবাই প্রগতিশীল আন্দোলনের রূপকার ছিলেন। পূর্ব পাকিস্থান কমিউনিস্ট পার্টি (এমএল)-এর সাথে এদের নিবিড় সম্পর্ক ছিল।
মণিরামপুর উপজেলার গোপালপুর গ্রামের মৃত রজব আলী দফাদার ও নুরজাহান বেগমের ছেলে মেধাবী সন্তান কমরেড ফজলুর রহমান ফজলু।
খোঁজ খবর নিয়ে জানাযায়, ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধচলাকালীন সময় ২৩ অক্টোবর সকালে মণিরামপুর উপজেলার রতেœস্বরপুর গ্রামের আব্দুর রহমানের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিল স্বাধীনতাকামী নিরস্ত্র এ পাঁচ যুবক। কিন্তু পাকহানাদার বাহিনীর দোসর রাজাকারদের চোখ এড়াতে পারেনি তারা। স্থানীয় রাজাকার কমান্ডার আব্দুল মালেক ডাক্তারের নেতৃত্বে মেহের জল্লাদ, ইসহাক, আব্দুল মজিদসহ বেশ কয়েকজন রাজাকার তাদের আশ্রয়স্থল চারিদিক থেকে ঘিরে ফেলে তাদেরকে আটক করে। এরপর তাদেরকে চোখ বেঁধে চিনাটোলা বাজারের পূর্বপাশে হরিহরনদীর তীরে নেয়া হয়। সেখানে নিয়ে বেয়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে তাদের শরীরে লবণ দেয়াসহ তাদের ওপর অমানবিক নির্যাতন চালানো হয়।
ওই নির্যাতনের প্রত্যক্ষদর্শী চিনাটোলার শ্যামাপদ নাথ বর্ণনা দিয়েছেন সেইদিনের নির্মমতার। তার ভাষায়, সেদিন তিনি ছিলেন ২৪ থেকে ২৫ বছরের টগবগে যুবক। শ্যামাপদ সে সময় চিনাটোলা বাজারে মুটেগিরির কাজ করতেন। রাজাকারদের নির্দেশে ওইদিন শ্যামাপদকে হরিহর নদীর ব্রীজ পাহারার দায়িত্ব দেয়া হয়।
তিনি জানান, ওই দিন রাত ৮টার দিকে চোখ বাঁধা অবস্থায় মুক্তি সেনা আসাদ, মানিক, ফজলু, শান্তি ও তোজোকে সৈয়দ মাহমুদপুর গ্রাম সংলগ্ন হরিহর নদীর ব্রীজের পাশে আনা হয়। তার কিছুক্ষন পর রাজাকার কমান্ডারের বাঁশি বেঁজে উঠার সাথে সাথে গর্জে ওঠে রাইফেল। মুহুর্তের মধ্যে পাঁচ তরতাজা যুবকের নিথরদেহ মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। রাজাকারদের ভয়ে সেদিন কেউ এগিয়ে না আসলেও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পরদিন সকালে তিনি (শ্যামাপদ) এবং স্থানীয় আকব্বর আলী নদীর তীরে যেখানে ওই ৫ মুক্তিকামী যুবককে হত্যা করা হয় সেখানে একটি বড় কবর খুড়ে একই কবরে তাদেরকে সমাহিত করেন।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, অযতেœ-অবহেলায় পড়ে আছে শহীদদের সেই বধ্যভূমি। কিন্তু রাষ্ট্রীয়ভাবে আজ পর্যন্ত শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের কোন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি।
এ ব্যাপারে মণিরামপুর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা গাজী আব্দুল হামিদ জানান, উল্লেখিত ৫ শহীদদের কবরসহ উপজেলার সকল শহীদদের স্মৃতি ও বদ্ধভুমি সংরক্ষনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষ থেকে সরকারের কাছে কয়েক দফা দাবি জানানো হয়েছে।