সাতক্ষীরায় কাঁকড়া চাষে ঝুঁকছে মানুষ: নতুন কর্মসংস্থান পাচ্ছে হাজার হাজার মানুষ

কর্তৃক Ahadur Rahman Jony
০ কমেন্ট 17 ভিউস

সচ্চিদানন্দদে সদয়,আশাশুনি: চিংড়ি ছিল ঘের বাণিজ্যের ‘সাদা সোনা’। দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের অর্থনীতির প্রতিভূ। সেইদিন বুঝি ফুরাচ্ছে। কম শ্রম ও কম খরচায় ঘেরে এখন চাষ হচ্ছে কাঁকড়া। কাঁকড়ার চাহিদা আর দাম চিংড়িকে পিছনে ফেলেছে। বড় সাইজের চিংড়ির মূল্য কেজি প্রতি ৫শ টাকা থেকে ৮শ টাকা আর একই সাইজের প্রতি কেজি কাঁকড়া বিক্রি হচ্ছে ১২শ থেকে ১৮শ টাকা। দেশের বাজারে তেমন চাহিদা না থাকলেও বিদেশে কাঁকড়ার চাহিদা অভাবনীয়। ফলে কাঁকড়া এখন বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সম্ভাবনার এক নতুন দুয়ার উন্মোচন করেছে। উপকূলীবর্তী এলাকার লবণপোড়া ফসলহীন জলাভূমিতে প্রায় অবহেলিত জলজ প্রাণী কাঁকড়া চাষে ভাগ্যের চাকা ঘুরছে, সচ্ছলতার মুখ দেখছে কাঁকড়া চাষি পরিবার। ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব আর আন্তজাতিক বাজারে দরপতনে সর্বস্বান্ত চিংড়ি চাষিরা কাঁকড়া চাষে ঝুঁকছেন।
কাঁকড়া চাষ করে আবারো উঠে দাঁড়াচ্ছেন চাষিরা। ঘের এলাকায় চিংড়ির মোকামগুলো কাঁকড়ার মোকামে রূপান্তরিত হচ্ছে। চিংড়ির আড়তের চেয়ে বাড়ছে কাঁকড়ার আড়তের সংখ্যা। সেকেলে– সনাতন পদ্ধতিকে পিছনে ফেলে উন্নত প্রযুক্তিতে উৎপাদন হচ্ছে কাঁকড়া। সনাতন পদ্ধতির কাঁকড়া চাষের মৌসুম মে থেকে ডিসেম্বর। আধুনিক ‘সফ্টেসল’ পদ্ধতিতে কাঁকড়া চাষ হচ্ছে সারা বছরই। একটি বেসরকারি সংস্থার তথ্য বলছে, সুন্দরবন এলাকায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার জেলে পরিবার কাঁকড়া ধরে জীবিকা নির্বাহ করছেন।
কাঁকড়া রপ্তানি প্রতিবছর গড়ে আয় হচ্ছে প্রায় ৪০০ কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা। কাঁকড়া চাষে ভাইরাস আক্রান্ত হওয়ার ভয় নেই। নেই বিনিয়োগের ঝুঁকি। প্রক্রিয়াকরণে জটিলতা বা দ্রুত পচনেরও ভয় নেই। চিংড়ির মতো পোনা কিনতে হয় না কাঁকড়ার। প্রাকৃতিকভাবেই লোনা পানিতে কাঁকড়া জন্মায়। ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি এবং জুন থেকে জুলাই হচ্ছে কাঁকড়ার প্রজননকাল। এ সময় গভীর সমুদ্রে ও সুন্দরবনের মধ্যে ডিম থেকে কাঁকড়া জন্ম নেয়। এসব পোনা পানিতে ভেসে এসে নদ-নদী, খাল ও মাছের ঘেরে আশ্রয় নিয়ে বড় হয়। নদী থেকে ঘেরে পানি উঠালেই লাখ লাখ পোনা পাওয়া যায়। কাঁকড়া এখন রপ্তানি হচ্ছে বিশ্বের অনন্ত ২৪টি দেশে। ভিয়েতনাম, জাপান, কোরিয়া, তাইওয়ান, হংকং, মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডে ছড়িয়ে পড়েছে বাংলাদেশি কাঁকড়ার সুখ্যাতি। বৃহত্তর খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা উপকূলে বহু এলাকায় হচ্ছে কাঁকড়ার চাষ। খুলনার পাইকগাছা, সাতক্ষীরার শ্যামনগর, বাগেরহাটের রামপাল ও মংলায় ঘেরের পাশাপাশি খামারে তিন পদ্ধতিতে কাঁকড়ার চাষ হচ্ছে। একটি পদ্ধতিতে ছোট ছোট পুকুরে রেখে মোটাতাজা করা হচ্ছে কাঁকড়া, আরেক পদ্ধতিতে বড় বড় ঘেরে চিংড়ির সঙ্গে কাঁকড়ার পোনা ছেড়ে বড় করা হচ্ছে, আবার উন্মুক্ত জলাশয়ে খাঁচায় আটকে রেখেও চাষ করা হচ্ছে কাঁকড়া।
দক্ষিণাঞ্চলে ব্যক্তিগত উদ্যোগে কয়েক হাজার কাঁকড়া মোটাতাজাকরণ খামার গড়ে উঠেছে। সাতক্ষীরার শ্যামনগর, কালীগঞ্জ, আশাশুনি, দেবহাটা, খুলনার পাইকগাছা, কপিলমুনি, বটিয়াঘাটা, দাকোপ, ডুমুরিয়া এবং বাগেরহাটের রামপাল ও মংলা উপজেলায় কয়েক শতাধিক মোটাতাজাকরণ খামার গড়ে উঠেছে। শুধু পাইকগাছাতেই রয়েছে ৩০০টি খামার। শ্যামনগরের কাঁকড়া খামারের মালিক রঘুচরন মালো জানান,মাত্র এক বিঘার কাঁকড়ার ঘেরে বছরে দেড় থেকে দুই লাখ টাকা লাভ করা যায়। কাঁকড়া ঘেরে ছাড়ার পর ২০ থেকে ২৫ দিনেই তা বিক্রির উপযোগী হয়।এসব কাঁকড়ার বড় অংশ পাঠানো হয়েছে চীনে। এছাড়া মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, তাইওয়ান, জাপান, সিঙ্গাপুর, কোরিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, মিয়ানমার এবং ইউরোপের কয়েকটি দেশ মিলিয়ে ২৪টি দেশে কাঁকড়া রফতানি হচ্ছে।আড়তদাররা জানালেন, কাঁকড়া ব্যবসা বেশ লাভজনক। বিশ্ববাজারে সুন্দরবনের কাঁকড়ার চাহিদা বেশি। বন থেকে যে কাঁকড়া ধরে আনা হয়, তা প্রথমে বাছাই করা হয়। শক্তগুলো রফতানির জন্য তৈরি করা হয় আর নরমগুলো মোটাতাজা করতে ঘেরে ছেড়ে দেয়া হয়। ১৫ থেকে ২০ দিনের মধ্যে সেই কাঁকড়াগুলো আবার শক্ত হয়ে গেলে রফতানি করা হয়। আশাশুনি উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা বলেন, কাঁকড়া মোটাতাজা করে চাষীরা দ্রুত লাভবান হচ্ছেন। কাঁকড়া চাষ উন্নত করার জন্য সংশিষ্টদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। পোনা উৎপাদন ও জীবিত কাঁকড়ার রফতানির পাশাপাশি প্রক্রিয়াজাতকরণের সুযোগ সৃষ্টি করা প্রয়োজন। এতে আরো কয়েক লাখ লোকের কর্মসংস্থান হবে।একজন ব্যবসায়ী জানান, কাঁকড়া আহরণ পরিবেশের ক্ষতি করে এমন খোঁড়া যুক্তিতে সরকার ১৯৯৭ সালের নভেম্বরে দেশজুড়ে কাঁকড়া আহরণ ও রপ্তানি নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। এতে বিদেশে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের কাঁকড়ার বাজার দখল করে নেয় ভারত, থাইল্যান্ড, মিয়ানমারসহ বেশ কয়েকটি দেশের ব্যবসায়ীরা। পরে কাঁকড়া ব্যবসায়ীদের চাপের মুখে সরকার রপ্তানি করার অনুমতি দিলেও সাগর বা উন্মুক্ত জলাশয় থেকে আহরণের ক্ষেত্রে সময়সীমা বেঁধে দেয়া হয়। ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি– এই তিন মাস বিদেশে কাঁকড়ার চাহিদা বেশি থাকে বলে এ সময়কে আহরণের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ব্যবসায়ীরা চান বিধিনিষেধমুক্ত পরিবেশ।

রিলেটেড পোস্ট

মতামত দিন

error: Content is protected !!