হারিয়ে যাচ্ছে আশাশুনির হস্তশিল্প মাদুর

কর্তৃক Ahadur Rahman Jony
০ কমেন্ট 13 ভিউস

সচ্চিদানন্দদে সদয়, আশাশুনি: আশাশুনির মাদুরের সুখ্যাতি আশাশুনি সহ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। সেই সুখ্যাতি আজ ইতিহাসের পাতায় লিপিবদ্ধ রয়েছে। কারন হিসেবে দেখা গেছে, আগে উপজেলার অধিকাংশ জমি পতিত থাকতো। সেখানে মাদুর তৈরির উপকরণ মেলে গাছ উৎপাদিত হতো। কিন্তু এখন জমির স্বল্পতা এবং উন্নত মানের বীজ পাওয়া যায় না। আগে নদীর ধারে চড়ায় বা খালের পাড়ে মাদুর বোনার কাঁচামাল মেলে উৎপন্ন হতো এবং সেখান থেকে মেলে সংগ্রহপূর্বক মাদুর তৈরি হতো। এক সময় আশাশুনি তথা সাতক্ষীরা জেলার মাদুরের সুনাম ছিল সুদূর ভারত পর্যন্ত। তখনকার দিনের হরেক রকম বুননি মাদুর দেশ-বিদেশের পর্যটকদের আশাশুনির মাদুরের প্রতি আকৃষ্ট করতো। উপজেলার কয়েক হাজার পরিবার মাদুর তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করতো। তাদের পরিবারে ছিল না কোনো অভাব-অনটন।সাতক্ষীরার সবচেয়ে বড় মাদুর শিল্প এলাকা আশাশুনি উপজেলার কাদাকাটি ইউনিয়ন। এ ইউনিয়নের ১৫টি গ্রামের মানুষ এ শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। এসব গ্রামের মধ্যে টেংরাখালী, তেঁতুলিয়া, মোকামখালী, তালবাড়িয়া, জোদুয়ারডাঙ্গা ও কাদাকাটি উল্লেখযোগ্য। টেংরাখালী গ্রামে সরেজমিন দেখা যায়, এ গ্রামের অধিকাংশ পরিবারের নারীরা মাদুর বুননের সঙ্গে যুক্ত। এমনই একজন লিপিকা রানী, যার সংসারের একমাত্র আয়ের উৎস মাদুর উৎপাদন। স্বামী-স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে চার সদস্যের সবাই মাদুর উৎপাদন ও বিপণনের সঙ্গে যুক্ত। লিপিকা নিজে মাদুর বুননের কাজ করেন। আর তার স্বামী উৎপাদিত মাদুর বিভিন্ন বাজারে বিক্রি করেন। কিন্তু প্রায় এক দশক ধরে মাদুর শিল্পের অবস্থা ক্রমাগত খারাপের দিকে যাচ্ছে বলে তিনি জানান।
শিবপদ বলেন, এলাকায় মাদুর উৎপাদনের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত মেলের উৎপাদন কমে গেছে। আশপাশে যা পাওয়া যাচ্ছে, তা অনেক বেশি দামে কিনতে হয়। ফলে মাদুর উৎপাদনে লাভ অনেক কমে গেছে। একই গ্রামের আশিষ বলেন, কয়েক বছর আগেও প্রতি কাউন মেলের দাম ছিল ২শ’৮০ থেকে ৩শ’ টাকা। এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫শ’৫০ থেকে ৬শ’ টাকায়। ফলে এক জোড়া মাঝারি ধরনের মাদুর উৎপাদনে ৫শ’ থেকে ৬শ’ টাকা ব্যয় হচ্ছে। অথচ বাজারে এ মাদুরের প্রতি জোড়ার পাইকারি দাম ৬শ’ টাকা। এতে এক জোড়া মাদুরে ৩০ থেকে ৪০ টাকার বেশি লাভ থাকছে না। ফলে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।তাছাড়া প্রযুক্তির কারনে মাদুর ব্যহারের প্রতি আগ্রহ কমছে জনসাধারনের।
একই গ্রামের রঞ্জন সরকার প্রায় ২০ বছর ধরে এ মাদুর শিল্পের সঙ্গে জড়িত। তিনি জানান, কয়েক বছর আগেও এ অঞ্চলের নদীতীরে প্রচুর মেলে চাষ হতো। কিন্তু এখন আর তা দেখা যায় না। দাম বেড়ে যাওয়ায় খরচ অনুযায়ী উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য দাম পাওয়া যায় না। এক জোড়া বড় আকৃতির মাদুর তৈরিতে উৎপাদন খরচ হয় প্রায় ৪শ’৫০ টাকা। অথচ এর বাজারমূল্য ৫শ’ থেকে ৫শ’২০ টাকা। মাদুর উৎ্পাদন থেকে প্রতি মাসে সর্বোচ্চ ৫ থেকে সাড়ে ৫ হাজার টাকা আয় হয়। এতো সব সংকটের মধ্যেও পূর্বপুরুষের এ পেশা ছেড়ে যেতে পারছেন না বলে তিনি জানান। বর্তমানে মেলে গাছের তীব্র সংকটের দরুন মাদুর শিল্পে নিয়োজিত শিল্পীরা বেকার হয়ে পড়েছে। এখন তারা পরিবার-পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে। অনেকে বাপ-দাদার পেশাকে টিকিয়ে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে। তারা মেলের অভাবে উন্নতমানের মাদুর তৈরি করতে পারছে না। উপকরণের মূল্য বৃদ্ধির কারণে একটি মেলেকে দুভাগ করে মাদুর তৈরি করতে হচ্ছে। ফলে উন্নত মাদুর তৈরি করা দুরূহ হয়ে পড়েছে। এখন আর ভালো বুনোনির মাদুর পাওয়া যায় না। আর যদিও পাওয়া যায় তার দাম ৫শ’/৬শ’ টাকা। আশাশুনির মাদুর শিল্পে বর্তমানে যে অবস্থা বিরাজ করছে আগামীতে মাদুর শিল্প বিলুপ্ত হয়ে যাবে বলে অভিজ্ঞ মহলের দাবি। এ শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে সর্বপ্রথম প্রয়োজন মেলে গাছ উৎপন্ন নিশ্চিত করা। আশাশুনি উপজেলায় মেলে গাছ উৎপাদনের উপযুক্ত এলাকা রয়েছে। লবাণাক্ত মাটিতে মেলে উৎপাদন ভালো হয়। আশানুরূপ পরিকল্পিত উপায়ে মেলের চাষ করলে আশাশুনি থানার মাদুরের সুখ্যাতি ধরে রাখা যাবে। আশাশুনি উপজেলার মাদুরের সুখ্যাতি সেই আগের মতো নেই। এখন নামেমাত্র সুখ্যাতির কথা রূপকথায় পরিণত হয়েছে।কাদাকাটি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান দীপঙ্কর কুমার সরকার বলেন, ইউনিয়নের অধিকাংশ পরিবার মাদুর শিল্পের সঙ্গে জড়িত। তবে বর্তমানে শিল্পটি অসিত্ব সংকটে পড়েছে। এরই মধ্যে কিছু পরিবার বংশ পরম্পরায় চলে আসা এ পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় চলে গেছে। এ অবস্থায় সরকারি সহায়তাই একমাত্র ঐতিহ্যবাহী এ শিল্প ও এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলোকে বাঁচাতে পারে।এখন আশাশুনির মাদুর দেশের অন্যান্য অঞ্চলে রপ্তানি তো হয়ই না বরং এলাকার চাহিদা মেটানো অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর এখন যে মাদুর তৈরি করা হয় তা মোটেও উন্নতমানের নয়। আশাশুনি উপজেলার ঐতিহ্যবাহী বড়দল হাটে একদা হাজার হাজার মাদুর পাওয়া যেতো। শুধু মাদুরের খ্যাতির জন্য বড়দল বাজার সুখ্যাতি অর্জন করে। বর্তমানে এখানে মাদুরের বাজার খুব করুন অবস্থা। এলাকার নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের সদস্যরা খেজুরের পাতার তৈরি মাদুর ব্যবহার করছে মেলের অভাবে।এখনসরকারি পদক্ষেপ ছাড়াও বেসরকারি পর্যায়ে উদ্যেগ গ্রহণ করলে মাদুর শিল্পের ভবিষ্যৎ ফিরে আসবে বলে অভিজ্ঞ মহল মনে করেন।
হারিয়ে যাচ্ছে আশাশুনির হস্তশিল্প মাদুর

সচ্চিদানন্দদেসদয়, আশাশুনি: আশাশুনির মাদুরের সুখ্যাতি আশাশুনি সহ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। সেই সুখ্যাতি আজ ইতিহাসের পাতায় লিপিবদ্ধ রয়েছে। কারন হিসেবে দেখা গেছে, আগে উপজেলার অধিকাংশ জমি পতিত থাকতো। সেখানে মাদুর তৈরির উপকরণ মেলে গাছ উৎপাদিত হতো। কিন্তু এখন জমির স্বল্পতা এবং উন্নত মানের বীজ পাওয়া যায় না। আগে নদীর ধারে চড়ায় বা খালের পাড়ে মাদুর বোনার কাঁচামাল মেলে উৎপন্ন হতো এবং সেখান থেকে মেলে সংগ্রহপূর্বক মাদুর তৈরি হতো। এক সময় আশাশুনি তথা সাতক্ষীরা জেলার মাদুরের সুনাম ছিল সুদূর ভারত পর্যন্ত। তখনকার দিনের হরেক রকম বুননি মাদুর দেশ-বিদেশের পর্যটকদের আশাশুনির মাদুরের প্রতি আকৃষ্ট করতো। উপজেলার কয়েক হাজার পরিবার মাদুর তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করতো। তাদের পরিবারে ছিল না কোনো অভাব-অনটন।সাতক্ষীরার সবচেয়ে বড় মাদুর শিল্প এলাকা আশাশুনি উপজেলার কাদাকাটি ইউনিয়ন। এ ইউনিয়নের ১৫টি গ্রামের মানুষ এ শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। এসব গ্রামের মধ্যে টেংরাখালী, তেঁতুলিয়া, মোকামখালী, তালবাড়িয়া, জোদুয়ারডাঙ্গা ও কাদাকাটি উল্লেখযোগ্য। টেংরাখালী গ্রামে সরেজমিন দেখা যায়, এ গ্রামের অধিকাংশ পরিবারের নারীরা মাদুর বুননের সঙ্গে যুক্ত। এমনই একজন লিপিকা রানী, যার সংসারের একমাত্র আয়ের উৎস মাদুর উৎপাদন। স্বামী-স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে চার সদস্যের সবাই মাদুর উৎপাদন ও বিপণনের সঙ্গে যুক্ত। লিপিকা নিজে মাদুর বুননের কাজ করেন। আর তার স্বামী উৎপাদিত মাদুর বিভিন্ন বাজারে বিক্রি করেন। কিন্তু প্রায় এক দশক ধরে মাদুর শিল্পের অবস্থা ক্রমাগত খারাপের দিকে যাচ্ছে বলে তিনি জানান।
শিবপদ বলেন, এলাকায় মাদুর উৎপাদনের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত মেলের উৎপাদন কমে গেছে। আশপাশে যা পাওয়া যাচ্ছে, তা অনেক বেশি দামে কিনতে হয়। ফলে মাদুর উৎপাদনে লাভ অনেক কমে গেছে। একই গ্রামের আশিষ বলেন, কয়েক বছর আগেও প্রতি কাউন মেলের দাম ছিল ২শ’৮০ থেকে ৩শ’ টাকা। এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫শ’৫০ থেকে ৬শ’ টাকায়। ফলে এক জোড়া মাঝারি ধরনের মাদুর উৎপাদনে ৫শ’ থেকে ৬শ’ টাকা ব্যয় হচ্ছে। অথচ বাজারে এ মাদুরের প্রতি জোড়ার পাইকারি দাম ৬শ’ টাকা। এতে এক জোড়া মাদুরে ৩০ থেকে ৪০ টাকার বেশি লাভ থাকছে না। ফলে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।তাছাড়া প্রযুক্তির কারনে মাদুর ব্যহারের প্রতি আগ্রহ কমছে জনসাধারনের।
একই গ্রামের রঞ্জন সরকার প্রায় ২০ বছর ধরে এ মাদুর শিল্পের সঙ্গে জড়িত। তিনি জানান, কয়েক বছর আগেও এ অঞ্চলের নদীতীরে প্রচুর মেলে চাষ হতো। কিন্তু এখন আর তা দেখা যায় না। দাম বেড়ে যাওয়ায় খরচ অনুযায়ী উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য দাম পাওয়া যায় না। এক জোড়া বড় আকৃতির মাদুর তৈরিতে উৎপাদন খরচ হয় প্রায় ৪শ’৫০ টাকা। অথচ এর বাজারমূল্য ৫শ’ থেকে ৫শ’২০ টাকা। মাদুর উৎ্পাদন থেকে প্রতি মাসে সর্বোচ্চ ৫ থেকে সাড়ে ৫ হাজার টাকা আয় হয়। এতো সব সংকটের মধ্যেও পূর্বপুরুষের এ পেশা ছেড়ে যেতে পারছেন না বলে তিনি জানান। বর্তমানে মেলে গাছের তীব্র সংকটের দরুন মাদুর শিল্পে নিয়োজিত শিল্পীরা বেকার হয়ে পড়েছে। এখন তারা পরিবার-পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে। অনেকে বাপ-দাদার পেশাকে টিকিয়ে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে। তারা মেলের অভাবে উন্নতমানের মাদুর তৈরি করতে পারছে না। উপকরণের মূল্য বৃদ্ধির কারণে একটি মেলেকে দুভাগ করে মাদুর তৈরি করতে হচ্ছে। ফলে উন্নত মাদুর তৈরি করা দুরূহ হয়ে পড়েছে। এখন আর ভালো বুনোনির মাদুর পাওয়া যায় না। আর যদিও পাওয়া যায় তার দাম ৫শ’/৬শ’ টাকা। আশাশুনির মাদুর শিল্পে বর্তমানে যে অবস্থা বিরাজ করছে আগামীতে মাদুর শিল্প বিলুপ্ত হয়ে যাবে বলে অভিজ্ঞ মহলের দাবি। এ শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে সর্বপ্রথম প্রয়োজন মেলে গাছ উৎপন্ন নিশ্চিত করা। আশাশুনি উপজেলায় মেলে গাছ উৎপাদনের উপযুক্ত এলাকা রয়েছে। লবাণাক্ত মাটিতে মেলে উৎপাদন ভালো হয়। আশানুরূপ পরিকল্পিত উপায়ে মেলের চাষ করলে আশাশুনি থানার মাদুরের সুখ্যাতি ধরে রাখা যাবে। আশাশুনি উপজেলার মাদুরের সুখ্যাতি সেই আগের মতো নেই। এখন নামেমাত্র সুখ্যাতির কথা রূপকথায় পরিণত হয়েছে।কাদাকাটি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান দীপঙ্কর কুমার সরকার বলেন, ইউনিয়নের অধিকাংশ পরিবার মাদুর শিল্পের সঙ্গে জড়িত। তবে বর্তমানে শিল্পটি অসিত্ব সংকটে পড়েছে। এরই মধ্যে কিছু পরিবার বংশ পরম্পরায় চলে আসা এ পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় চলে গেছে। এ অবস্থায় সরকারি সহায়তাই একমাত্র ঐতিহ্যবাহী এ শিল্প ও এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলোকে বাঁচাতে পারে।এখন আশাশুনির মাদুর দেশের অন্যান্য অঞ্চলে রপ্তানি তো হয়ই না বরং এলাকার চাহিদা মেটানো অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর এখন যে মাদুর তৈরি করা হয় তা মোটেও উন্নতমানের নয়। আশাশুনি উপজেলার ঐতিহ্যবাহী বড়দল হাটে একদা হাজার হাজার মাদুর পাওয়া যেতো। শুধু মাদুরের খ্যাতির জন্য বড়দল বাজার সুখ্যাতি অর্জন করে। বর্তমানে এখানে মাদুরের বাজার খুব করুন অবস্থা। এলাকার নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের সদস্যরা খেজুরের পাতার তৈরি মাদুর ব্যবহার করছে মেলের অভাবে।এখনসরকারি পদক্ষেপ ছাড়াও বেসরকারি পর্যায়ে উদ্যেগ গ্রহণ করলে মাদুর শিল্পের ভবিষ্যৎ ফিরে আসবে বলে অভিজ্ঞ মহল মনে করেন।

রিলেটেড পোস্ট

মতামত দিন

error: Content is protected !!